সামাজিক সমস্যা সমাধানে সমাজ মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা আলোচনা কর

সামাজিক সমস্যা সমাধানে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সমাজ মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা আলোচনা কর।

অথবা, সামাজিক সমস্যা সমধানে মনোবিজ্ঞান কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে? বিস্তারিত আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়েছে। আজ পৃথিবীর এমন কোনো স্থান নেই যেখানে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ছোয়া লাগেনি। পৃথিবীর সর্বত্র বিজ্ঞানের ছোয়া বা এর অবদান বিদ্যমান। তেমনিভাবে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সাথে মনোবিজ্ঞানও থেমে নেই। আর এসকল বিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানব কল্যাণ সাধন করা। সমাজে বিদ্যমান নানা সামাজিক সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শান্তি ও সুখ-সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে সমাজ মনোবিজ্ঞানীগণ তাদের আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক নানা সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সামাজিক সমস্যা সমাধানেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সমাজ মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা : সামাজিক সমস্যা সমাধানে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সমাজ মনোবিজ্ঞান ভূমিকা অনস্বীকার্য। সামাজিক যেসব সমস্যা সমাধানে সমাজ মনোবিজ্ঞান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে নিম্নে তা তুলে ধরা হলো :

১. ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণে সামাজিক প্রভাব : আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক ব্যক্তির সাথে পরিচিত হই যাদের আচরণ স্বাভাবিক নয়। এমনকি অনেকে উন্মাদের মতও আচরণ করে। মানুষের এ ধরনের আচরণের অনেক কারণও রয়েছে। কাজেই ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণ কিভাবে মুহূর্তে স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষ অবদান রাখে।

২. ভাষার কাঠামো নির্ধারণ মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। তাছাড়া মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষাকে আমরা ভাব বিনিময়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করি। আর এরূপ প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকারের মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। কাজেই পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য কিরূপ ভাষা ব্যবহার করা উচিত এর কাঠামো নির্ধারণে সমাজ মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম।

৩. সামাজিক পরিবেশের সমন্বয় সামাজিক সমন্বয় যেমন সামাজিক পরিবেশের সাথে কিভাবে সমন্বয় করে চলা যায় তা নির্ধারণ করে দেয় সমাজ মনোবিজ্ঞান। সামাজিক পরিবেশের সাথে সমাজের যাবতীয় অবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক বিদ্যমান। কাজেই সামাজিক পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সমাজ মনোবিজ্ঞান সামাজিক সমস্যা সমাধান করে থাকে।

৪. সামাজিক সংঘাত সমাধান : সমাজ জীবনে মানুষ যে সব সময় সুখী জীবন যাপন করে তা নয়। অনেক সময় পারস্পরিক সম্পর্কের বিপরীতে দ্বন্দ্ব সংঘাতও সৃষ্টি হয়। তখন পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণে প্রতিজ্ঞ হয়। আর এই আক্রমণ নিরসনে সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষ অবদান রাখে। তাছাড়া বর্তমান সমগ্র বিশ্বে চলছে আন্তর্জাতিক সংঘাত। আর এ আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসন করে কিভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করা যাবে সে সম্পর্কে পথ বাতলে দেয় সমাজ মনোবিজ্ঞান ।

৫. বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকা পালন: সামাজিক জীবনে মানুষ শুধুমাত্র একটি ভূমিকা বা দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিটি ব্যক্তিকে একাধারে নানাবিধ ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেমন একজন চাকরিজীবী যেমন অফিসে কর্মকর্তা, বাড়িতে সে কারো স্বামী, কারো পিতা, কারো ভাই, কারো সন্তান। বাইরে কারো বন্ধু প্রভৃতি। আর বিভিন্ন ভূমিকা সম্পর্কে সমাজের প্রত্যাশা থাকে। আমাদের সামাজিক জীবনে তখনই সমন্বয় সাধন করতে পারি যখন একজন ব্যক্তি তার প্রদত্ত ভূমিকা ও দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পাদন করতে পারি। এজন্য সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষ অবদান রাখে।

৬. বেকারত্ব ও কর্মহীনতা : বর্তমান সময়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এবং মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অনেক সময় একজন যোগ্য ব্যক্তি হয়ত তার কাজ পান না। মানুষ যে কাজ পছন্দ করে না তা যদি তাকে করতে হয় তবে কাজে মনোযোগ আসে না এবং তা ভালোভাবে সম্পাদনও হয় না। এমনকি কাজে ফাঁকি দেবার প্রবণতা তৈরি হয়। সমাজ মনোবিজ্ঞান বেকার জনগোষ্ঠীকে মানসিক মনোবল বৃদ্ধি ও কাজের সন্ধানে সাহায্য করে।

৭. দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন : দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সমাজ কাঠামোতে প্রভাব পড়ে। এবং এর ফলে মানুষের আচরণেও প্রভাব পড়ে। এরূপ সমাজ কাঠামো পরিবর্তন মানুষের সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। দ্রুত সমাজ পরিবর্তনে সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। সমাজে এ ধরনের জেনারেশনাল গ্যাপ দেখা দেয়। সমাজ মনোবিজ্ঞান এই বিশৃঙ্খলা দূর করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে ।

৮. সামাজিক অপরাধ হ্রাস: সামাজিক অহেতুক বাধা নিষেধ সমাজে নানাবিধ অপরাধের জন্ম দেয়। সামাজিক নির্যাতন ও শোষণ মানুষের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী। এছাড়া ব্যক্তিগত পেশীশক্তিও অনেককে অপরাধী করতে সাহায্য করে। তাছাড়াও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও সমাজে অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টি করে। সমাজ মনোবিজ্ঞানীদের কাজ হলো বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অপরাধের কারণ উদঘাটন করে এর সমাধানের প্রতিরোধের পথ তৈরি করা। কিভাবে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা যায় সেজন্য সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষ অবদান রাখে।

৯. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদ বিলোপ : আন্তর্জাতিক সংঘাত মানুষের সার্বিক কল্যাণের পরিপন্থি। যুদ্ধংদেহী ভাব মানুষের মজ্জাগত, এরূপ ধারণার ফলে অনেকে যুদ্ধকে অনিবার্য বলে মনে করে। তবে এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। জাতি সংঘাত দূর করে সমাজ মনোবিজ্ঞান প্রতিটি দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। উগ্রজাতীয়তাবাদ অনেক আন্তর্জাতিক সংঘাতের জন্য দায়ী। নিজের জাতির প্রতি অন্ধ মনোভাব অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে। আর এই জাতীয়তাবাদকে বিলোপ করে সমাজ মনোবিজ্ঞান প্রতিটি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখে।

১০. জাতি, ধর্ম, বর্ণ প্রথা বিলোপ : জাতি, ধর্ম, বর্ণ, প্রথা অতি প্রাচীন আর এ কারণে অতি প্রাচীনকাল থেকে ধনীরা দরিদ্রদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এ কারণে নানা যুদ্ধবিগ্রহ ও অশান্তি তৈরি করে চলমান সমাজ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। সমাজ মনোবিজ্ঞানে বিশ্বাস করা হয় সমাজের সকল মানুষ সমান। কাজেই জাতি ধর্ম, বর্ণ, প্রথা বিলোপে এর পদক্ষেপ অনস্বীকার্য।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সামাজিক পারস্পরিক সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একই সাথে জাতীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষভাবে তার অবদান রাখে। সমাজ মনোবিজ্ঞান পাঠ মানুষের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে ও প্রত্যাশিত আচরণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে দেখা যায় সামাজিক সমস্যা সমাধানে সমাজ মনোবিজ্ঞানীগণ বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করে এর কারণ ও সমস্যা নির্ণয়ের পথ বাতলে দেয়।

 

Leave a Comment