সামাজিক মনোবিজ্ঞানের পরিধি ও পরিসর আলোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি বর্ণনা কর।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিসরের ব্যাখ্যা দাও।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি সম্পর্কে যা জান বিস্তারিত লিখ।

উত্তর : 

ভূমিকা : সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ ছাড়া মানুষের জীবনকে কল্পনাও করা যায় না। মানুষের প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে সমাজ । মানুষের প্রকৃতিই মানুষকে সামাজিক হতে শিখিয়েছে। সামাজিক পরিবেশে মেলামেশা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও আদান-প্রদানের মাধ্যমে মানুষের জীবনে নতুন পরিবেশের জন্ম নেয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার আচরণ দ্বারা সমাজের অন্যান্যদেরকে উদ্দীপ্ত করে এবং তাদের আচরণকে প্রভাবিত করে। এভাবে সমাজে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ব্যক্তির সাথে সমাজ ও গোষ্ঠীর সম্পর্ক তৈরি হয়। ব্যক্তির বিশ্বাস, আচরণ ব্যবহার নতুন রূপ গ্রহণ করে। আর এ সংক্রান্ত আলোচনায় সমাজ মনোবিজ্ঞান বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি ও পরিসর : উদ্ভাবিত প্রতিটি বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। বিশাল বিজ্ঞান জগতে প্রতিটি বিজ্ঞানকে নির্ধারণ করতেই এই সীমাকরণ করা হয়েছে। কিন্তু এই ‘সীমা স্থায়ী নয়। ক্রমেই তা বর্ধিত হতে থাকে। নিম্নে সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি ও পরিসর আলোচনা করা হলো:

১. সামাজিকীকরণ : সামাজিকীকরণ মানব শিশুর একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া। এছাড়া এটি ব্যক্তির জীবন ব্যাপী প্রক্রিয়াও বটে। সামাজিকীকরণ সমাজ মনোবিজ্ঞানের অধ্যয়নের বিষয়। প্রতিটি মানব শিশু সমাজে জন্মগ্রহণ করে এবং বিভিন্ন মাধ্যম হতে শিশুর সামাজিকীকরণের মাধ্যমে এর বিকাশ ঘটে। আর সামাজিকীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ তাই সামাজিকীকরণ সমাজ মনোবিজ্ঞানের পাঠের অন্তর্ভুক্ত।

২. সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া : সমাজে বসবাস করার মাধ্যমে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। আর ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলেই ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সমাজ মনোবিজ্ঞান সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। যা ব্যক্তির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে ।

Also Read,

৩. গোষ্ঠীর আলোচনা : মানুষ একদিকে যেমন সামাজিক জীব হিসেবে থাকতে ভালোবাসে অন্যদিকে মানুষ অনেক বেশি গোষ্ঠীপ্রিয় ৷ গোষ্ঠী ছাড়া মানুষ নিজেকে কল্পনাও করে না। গোষ্ঠী চেতনার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে সামাজিক সংহতি। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর গঠন, প্রকৃতি, বিকাশ, ভূমিকা এবং গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে সম্পর্ক। গোষ্ঠী নেতৃত্বের রূপরেখা প্রতিটি সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

৪. ব্যক্তিত্ব ও সংস্কৃতি : মানুষের সার্বিক ও সমগ্র আচরণ হলো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব। আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। আবার সংস্কৃতির মধ্যেই শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। কাজেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন রূপ সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় ।

৫. সামাজিক বংশগতি : বংশগতি ব্যক্তির মানসিকতার উপর প্রভাব বিস্তার করে। গোষ্ঠীর ন্যায় প্রতিটি মানুষ তার বংশের ধারা রক্ষায় সচেষ্ট থাকে। বংশের প্রতিটি মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করাও মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রকৃতি। আর বংশ ধারাবাহিকতা দেখে বা শুনেও মনোবিজ্ঞানীরা যে কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যে সব করা যায় সে সবের অধ্যায়নও সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

৬. সামাজিক আচরণ-আচরণ : সুষ্ঠুভাবে সমাজ জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সমাজ তার প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে সব সময় ভাল আচরণ প্রত্যাশা করে। এছাড়াও আচার-ব্যবহার বা আচরণ সংক্রান্ত আলোচনার জন্যই সমাজ মনোবিজ্ঞানের মূল বিষয় । কিভাবে সামাজিক আচরণ তৈরি হয়, আচরণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, প্রভৃতি সমাজ মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে।

৭. নেতৃত্ব : সমাজ কিংবা দেশ এমনকি পরিবারকে সুষ্ঠুভাবে চালনার জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব। নেতৃত্ব ছাড়া সমাজ, দেশ চলতে পারে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং নেতৃত্ব সম্পর্কে সমাজ মনোবিজ্ঞানের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

৮. সামাজিক ব্যাধি : মানব সমাজে এমন কিছু প্রথা প্রচলিত যা সামাজিক ব্যাধি হওয়া সত্ত্বেও সকলে মেনে চলে। বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি যেমন-অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব, কিশোর অপরাধ, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বর্ণবৈষম্য, বদ্ধমূল ধারণা, হীনমন্যতা, কুসংস্কার, আক্রমণাত্মক আচরণ ইত্যাদি বিষয়েও সমাজ মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে।

৯. সামাজিক মনোভাব : সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিটি মানুষের সমাজের বিভিন্ন ঘটনার প্রতি মনোভাবের জন্ম হয়। কাজেই ব্যক্তির মধ্যে মনোভাবের উৎপত্তি, মনোভাবের বিকাশ ও বিস্তার, মনোভাবের পরিবর্তন, পূর্বসংস্কার মনোভাবের গতিশীলতা, জনমত, প্রচারণা, মনস্তাত্ত্বিক উপাদান, জনমত, পরিমাপের সমস্যা ইত্যাদি সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।

১০. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা: সমাজ জীবনে কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। জন্ম থেকে মৃত্যু তার পরিবার, সমাজ, দেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্য কারো না কারো উপর নির্ভরশীল। আর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সমাজ মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, সামাজিক, দলীয় সংহতি ইত্যাদি বিষয়গুলো পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয়। এ বিষয়গুলো সমাজ মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে।

১১. সহানুবর্তিতা ও সামাজিক আদর্শঃ সহানুবর্তিতা ও সামাজিক আদর্শ মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত কোনো মানবিক গুণ নয়। এটি সমাজে বসবাস করার মাধ্যমে অর্জিত হয়। সহানুবর্তিতা ও সামাজিক আদর্শ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্তির আচার-আচরণ নির্ধারণ করে। অনেক সময় কারো চাপে পড়েও সহানুবর্তিতা তৈরি হয়। যেখানেই তা তৈরি হোক না কেন তা সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়বস্তু।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজস্থ মানুষের আচার-আচরণের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা হলো সমাজ মনোবিজ্ঞান। বস্তুত আধুনিক যুগে মানুষের জীবন যতই জটিল হচ্ছে সমাজ মনোবিজ্ঞানের পরিধি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া সমাজ মনোবিজ্ঞানের কল্যাণে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও সামাজিক ব্যাধিকে দূরে ফেলে সমাজকে ঢেলে সাজানো সম্ভব হয়েছে।

Leave a Comment