সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্ব বর্ণনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব বা তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর সমাজ গবেষণার নীতিগত দিকের মূল্যায়ন কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানব সভ্যতা বিকাশের যুগে সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা সমাজ মনোবিজ্ঞান মানব সমাজের আচার-আচরণ, কৃষ্টি, বশ্যতা সবকিছু নিয়েই বিশ্লেষণ করে থাকে। তাছাড়া সমাজ মনোবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া। কাজেই সমাজ জীবনে কিভাবে মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াকে উন্নত করা যায় তার জন্য সমাজ মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সমাজের সংস্কার সাধন, আচার-ব্যবহার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, কৃষ্টি, সভ্যতা নিয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা করে এবং এ সম্পর্কে বাস্তব সমাধান প্রদান করে। কাজেই সমাজ জীবনে সমাজ মনোবিজ্ঞানের পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

১. সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনীয়তা : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কেননা এ গবেষণার মাধ্যমে মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা যায়। তাছাড়া এর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান দ্বারা ব্যক্তি তার আচার-আচরণ পরিবর্তন করে নিজেকে সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত করতে পারে। নিম্নে সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো :

১. জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্বের দ্বারা আমরা আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে বৃদ্ধি করতে পারি। এর মাধ্যমে মানুষও সমাজ সম্পর্কে নতুন ধারণা লাভ করে ব্যক্তির আচরণ বা সামাজিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায়। এ গবেষণা মানুষকে সুপরিকল্পিত পথে পরিচালিত করতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতা আরো বেশি পরিশীলিত ও সমৃদ্ধ হয়।

২. কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা দূরীকরণ : মানুষের মনে যে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা ছিল এবং যুগ যুগ ধরে যে ধারণা চালিত হয়ে আসছে তা সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত বিষয়কে সামনে নিয়ে গবেষণা করে সমস্যা সমাধান করে। এর মাধ্যমে সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর হয়।

৩. নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন এবং প্রচলিত তত্ত্বের উন্নয়ন সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে মানুষের আচরণ, মানসিক প্রক্রিয়া, মূল্যবোধ, বিশ্বাস সম্পর্কে নতুন নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করা যায়। এছাড়া এ গবেষণার মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানে যে প্রচলিত পদ্ধতি বা তত্ত্ব রয়েছে তার ব্যাপক উন্নতি সাধন করা সম্ভব। আর এসব তত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ মানুষ ও সমাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

৪. সঠিক ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ : সমাজ মনোবিজ্ঞানে গবেষণার মাধ্যমে সমাজের এবং ব্যক্তি জীবনে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে যে কোনো সামাজিক পরিকল্পনা ও নীতি গ্রহণের জন্য সামাজিক অবস্থা বা সম্পদ, দায় ও সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্বেই সঠিক তথ্য পাওয়া যায়। ফলে মানুষ তথা সমাজ জীবনে একটি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব। যা মানব সমাজ উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

৫. আচরণের ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত ধারণা প্রদান : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে মানুষের আচরণ সম্পর্কে পূর্বোক্ত ধারণা, সতর্কতা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করে। কেননা সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে যোগসূত্র স্থাপন করা। আবার এর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে মানুষের আচরণ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব। যা মানুষের চলার পথকে সহজ করে দেয়।

৬. গবেষণা পদ্ধতির উন্নয়ন সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি পদ্ধতি নয় বরং একাধিক পদ্ধতির প্রয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার জন্য যে পদ্ধতিটি মনোবিজ্ঞানীগণ অধিক যুক্তিসম্মত বলে মনে করেন সেই পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেন। তবে অনেক সময় এসকল পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। আবার এ পদ্ধতি বিষয়বস্তুর জন্য অযোগ্য হতে পারে। এজন্য মনোবিজ্ঞানীগণ গবেষণার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টার করেন। একই সাথে প্রচলিত পদ্ধতির উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

৭. দ্বন্দ্ব নিরসন : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে সমাজে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান তা নিরসন করা যায়। এছাড়া বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হানাহানি রয়েছে তা সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব। এছাড়া সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে ব্যক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরসনের মাধ্যমে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যা বর্তমান সমাজ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৮. সমাজ কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের মাধ্যমে ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্কের ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার সাহায্যে ব্যক্তির বিভিন্ন সামাজিক আচরণ পরিবর্তন করা যায় এবং একই সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। এ বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে যেহেতু সমাজের বিভিন্ন সমস্যার কারণ উন্মোচিত হয় তাই এর মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় ।

৯. বাস্তব সমস্যা সমাধান : সমাজ মনোবিজ্ঞান একটি বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধান বিজ্ঞান। এ বিজ্ঞান বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও মানসিক গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করে। শুধু তাই নয় বাস্তবে কিভাবে সমস্যা নির্মূল করা যায় তাই সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রধান লক্ষ্য। এ গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিটি সমস্যার স্থায়ী পরিবর্তন ও সমাধান আনয়ন করা হয়।

১০. আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন: সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান আচরণের স্থায়ী পরিবর্তন আনয়ন করা যায়। শিশুর সমাজিকীকরণের জন্য এ গবেষণা অত্যন্ত উপযোগী । এ গবেষণা মানুষের আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাছাড়া এ গবেষণা পদ্ধতি পরিচালনার সময় গবেষক ও উত্তরদাতা যেন কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা হয়। উন্মাদ ও শিশুর যে কোনো বিষয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে সমাজ মনোবিজ্ঞান তথ্য সরবরাহ করে জ্ঞান জগৎকে সমৃদ্ধ করে। তাই বাস্তবিক পক্ষে সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্ব অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য।

Leave a Comment