সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় পরীক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানে পরীক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার বিশ্লেষণ কর।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় পরিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে যা জান লিখ।

উত্তর :

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক চরিত্র অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে। মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহের মধ্যে পরীক্ষণ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি বলে মনে করা হয় এবং মনোবিজ্ঞানীগণ অন্যান্য যে কোনো পদ্ধতির চেয়ে এ পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করে থাকেন। কারণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যে সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান তা পরীক্ষণ পদ্ধতিতে বিদ্যমান। যেমন কার্যকরণ, বস্তুনিষ্ঠতা, নিয়ন্ত্রণ, পুনরাবৃত্তি, যথার্থতা প্রমাণ প্রভৃতি সবই পরীক্ষণ পদ্ধতিতে বিদ্যমান। পরীক্ষণ পদ্ধতিকে নিরীক্ষণ পদ্ধতিও বলা হয়ে থাকে ।

পরীক্ষণ পদ্ধতি : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সুব্যবস্থিত ও সুপরিকল্পিত অবস্থায় সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্দীপকের প্রতি পরীক্ষণ পাত্রের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গবেষণা করা হয়। যে অনুসন্ধান কাজে উদ্দীপকের প্রভাবের উপর অনুসন্ধানকারীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে তাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি বলে। পরীক্ষণ কার্যে সাধারণত গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ভেতর পরিচালনা করা হয়ে থাকে। তবে অনুরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে গবেষণাগারের বাইরেও পরীক্ষণ কার্যে পরিচালনা করা যেতে পারে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : পরীক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বলেন :

Barry F. Anderson, “পরীক্ষণ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কেউ দু’টি চলের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য একটির মধ্যে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন এনে দেখেন অন্যটির মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় কিনা। 

Wayne weiten বলেন- “পরীক্ষণ হলো এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি যেখানে অনুসন্ধানকারী সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি চল প্রয়োগ করেন এবং তার ফলে দ্বিতীয় চলের কোনো পরিবর্তন আসে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হয় ।”

William Buskist, “পরীক্ষণ হলো একটি গবেষণা পদ্ধতি যেখানে অনুসন্ধানকারী কতগুলো নির্দিষ্ট চল প্রয়োগ করেন এবং অন্যান্য চলের উপর তাদের প্রভাব পরিমাপ করেন।”

ব্যবহৃত চল: পরীক্ষণ কার্য যথাযথভাবে সম্পাদন করার জন্য গবেষকগণ এ ধরনের চলের পরীক্ষণ পদ্ধতিতে ব্যবহার করে থাকে। যথা 

১. অনির্ভরশীল চল বা স্বাধীন চল: যে চল অন্য কোনো চলের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেই স্বাধীনভাবে অন্য উদ্দীপক বা আচরণের উপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে বা পরিবর্তন আনতে সক্ষম তাকে অনির্ভরশীল চল বা স্বাধীন চল বলে। পরীক্ষণে এ চল কখনো অনুপস্থিত থাকে না। যদি থাকে তবে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

২. নির্ভরশীল চল বা পরাধীন চল: যে চলকে তার উপস্থিতি বা সৃষ্টির জন্য স্বাধীন বা অনির্ভরশীল চলের উপর নির্ভর করতে হয় তাকে নির্ভরশীল চল বা পরাধীন চল বলে। এ চল অনির্ভরশীল চল দ্বারা সৃষ্টি, প্রভাবিত, বা পরিবর্তিত হয়।

৩. মধ্যবর্তী চল : অনির্ভরশীল চল ও নির্ভরশীল চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী চলকে মধ্যবর্তী বা অন্তবর্তী চল বলে। পরীক্ষণ পাত্রে বয়স, লিঙ্গ, ওজন, উচ্চতা ইত্যাদি মধ্যবর্তী বলের উদাহরণ।

৪. বাহ্যিক চল: বাহ্যিক পরিবেশ থেকে যে সব চল উদ্ভব হয় তাকে বাহ্যিক চল বলা হয়। যেমন তাপমাত্রা, মিছিলের শব্দ, বাইরের হট্টগোল, বা হৈ, চৈ প্রভৃতি বাহ্যিক চলের উদাহরণ।

পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা : পরীক্ষণ পদ্ধতির কতিপয় সুবিধা হলো –

১. পরীক্ষণ পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক নিয়ম নীতি বেশি মেনে চলা হয়।

২. এ পদ্ধতির প্রধান সুবিধা হলো এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা হয় বলে প্রয়োজনাতিরিক্ত কোনো চল পরীক্ষণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না ।

৩. গবেষণাগারের কৃত্রিম পরিবেশ পরীক্ষকের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। তাই পরীক্ষণকারী তার সুবিধামত এবং পরীক্ষণের প্রয়োজনমত তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলের পরিবর্তন আনতে পারেন।

৪. পরীক্ষণে ঘটনা বা বিষয়বস্তু পূর্ণ পুনারাবৃত্তি করা যায়।

৫. এ পদ্ধতিতে ফলাফল ব্যক্তি দোষে দুষ্ট হতে পারে না। পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকে না।

৬. এ পদ্ধতিতে অনির্ভরশীল চলের পরিবর্তনের পরিমাণ প্রাপ্ত তথ্যের সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণ করা যায়।

৭. এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ফলাফলের যথার্থতা ও নির্ভরশীলতা যাচাই করা যায়।

৮. পরীক্ষণ পাত্রের নকশা অনুযায়ী চলের বিন্যাসও ব্যবহার করা যায়।

৯. পরীক্ষণের নিয়মাবলি ও ফলাফল বস্তুনিষ্ঠভাবে অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের অবগতির জন্য প্রকাশ করা যায়।

১০. বিষয়বস্তুর কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা যায়।

পরীক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কতিপয় অসুবিধা হলো।

১। যেসব ঘটনা গবেষণাগারে পরীক্ষা করা যায় না, অথবা যেসব ঘটনা পরীক্ষার জন্য পরীক্ষণকারীকে অনিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করতে হয় সেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতি অচল ।

২. সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে যেসব আচরণ সৃষ্টি হয় (জনমত, মনোভাব, মূল্যবোধ) সেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার অসুবিধাজনক।

৩. এ পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারী সব সময় পরীক্ষণকারীকে সাহায্য নাও করতে পারে।

৪. এ পদ্ধতির অন্যতম অসুবিধা হলো কৃত্রিম পরিবেশ। কৃত্রিম পরিবেশে গবেষণা চালনা করা হয় বলে প্রাণীর আচরণ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। যা গবেষণার জন্য সমস্যা তৈরি করে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, পরীক্ষণ পদ্ধতিতে গবেষণায় অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বরং অনেক বেশি। বরং সঠিক পরিকল্পনা ও সতর্কতা অবলম্বন করলে এ সব অসুবিধা দূর করে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া পরীক্ষণ পদ্ধতির অবদান মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দান করেছে। ফলে বর্তমান সময়ে মনোবিজ্ঞান সর্বাধিক পরীক্ষণের মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট। ফলে পরীক্ষণ পদ্ধতির অবদান অনস্বীকার্য। ফলে বর্তমান সময়ে মনোবিজ্ঞান সর্বাধিক পরীক্ষণের মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট। ফলে পরীক্ষণ পদ্ধতির অবদান অনস্বীকার্য।

Leave a Comment