সমাজ মনোবিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে যা জান তা আলোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বর্ণনা দাও।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দাও ।

উত্তর : 

ভূমিকা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পদ্ধতি। বহু পূর্ব থেকেই মনোবিজ্ঞান গবেষণায় এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরীক্ষণ পদ্ধতির পূর্বে যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল এবং একাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে তা হলো পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি। মানব সমাজে এমন কতগুলো আচরণ বা ঘটনা যা পরীক্ষাগারে বা গবেষণাগারে তৈরি করা যায় না। সেসব আচরণ ও ঘটনা সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো বিষয় বা ঘটনা সামনে উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি : যে কোনো সমাজ সংক্রান্ত গবেষণার প্রাথমিক কাজ হলো ঘটনাটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করা। এটি সামাজিক গবেষণার অন্যতম একটি মৌলিক তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। বস্তুত সমাজ মনোবিজ্ঞানের উন্মেষ ও বিকাশে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি প্রধান ভূমিকা পালনকারী কৌশল। সমসাময়িক কালের প্রচলিত তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এমন একটি গবেষণামূলক তথ্যনুসন্ধান পদ্ধতি যেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো বিষয় বা ঘটনার সামনে উপস্থিত হয়ে সরাসরি প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অন্যভাবে বলা যায় বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা ঘটনা সুশৃঙ্খলভাবে অবলোকন ও নির্ধারণ করাকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে।

P.V young বলেন, “দৃশ্যমান ঘটনা বা বিষয়কে সুশৃঙ্খলভাবে নিরীক্ষণ করাই হলো পর্যবেক্ষণ।”

Concise oxford Dictionary তে এর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয় যে, পর্যবেক্ষণ হলো পারস্পরিক সম্পর্ক ও কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে সংঘটিত ঘটনাবলি সঠিকভাবে দর্শন ও ধারণ।

  1. Hickman বলেন, “পর্যবেক্ষণ দৈনন্দিন জীবনের কেবল একটি প্রয়োজনীয় তৎপরতায় নয় বরং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রাথমিক উপকরণও বটে।”

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ১. প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ 

২. পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ ।

১. প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ : প্রাকৃতিক পরিবেশে সংঘটিত কোনো ঘটনাকে অনুরূপভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলতে মূলত প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণকেই বোঝায় । প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণে দু’টি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান

(ক) পর্যবেক্ষণকারী স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে পরীক্ষণ পাত্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।

(খ) পরীক্ষণ পাত্রের স্বাভাবিক আচরণ যাতে বিঘ্ন না হয় পর্যবেক্ষণকারী সেদিকে খেয়াল রাখেন। প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ তখনই সর্বোত্তম হবে। যখন পরীক্ষণ পাত্র বুঝতে না পারে যে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

২. পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ : যখন কোনো পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাভাবিক পরিবেশে তথ্য সংগ্রহ করা হয় তাকে পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ঘটনার কোন কোন উপাদান পর্যবেক্ষণ করা হবে, কখন এবং কিভাবে করতে হবে, কি কি উপকরণ উপস্থাপিত করতে হবে প্রভৃতি বিষয়গুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে নিতে হয়। অর্থাৎ পূর্ব পরিকল্পিত উপায়ে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় সরাসরি স্বাভাবিক পরিবেশে প্রত্যক্ষণ করাকে পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ বলে।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কতিপয় সুবিধা : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কতিপয় সুবিধা হলো :

১. সমাজে মানুষের সব ধরনের আচরণ প্রায় এ পদ্ধতির আয়ত্তাধীন।

২. নির্ধারিত ঘটনা বা আচরণকে স্বাভাবিক পরিবেশে যখন ঘটনাটি ঘটছে তখন তা পর্যবেক্ষণ করা যায় ।

৩. এ পদ্ধতির জন্য মনোবিজ্ঞানীকে বিশেষ কোনো গাণিতিক পদ্ধতি ও যুক্তির প্রয়োজন হয় না বা ব্যবহার করতে

৪. শিশু আচরণ ও প্রাণী আচরণ সম্পর্কে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি খুবই সুবিধাজনক।

৫. পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বাস্তবে কতটুকু কার্যকর তা পরীক্ষা করার জন্য তা স্বাভাবিক পরিবেশে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

৬. এ পদ্ধতিতে বলের আচরণ নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো জটিলতা নেই।

৭. এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত তথ্যরাশি পরিসংখ্যানের সাহায্য প্রকাশ করা যায়।

৮. এজন্য তেমন বেশি জনবল ও অর্থের প্রয়োজন হয় না।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কতিপয় অসুবিধা হলো:

১. পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য পুনরাবৃত্তি প্রায় অসম্ভব। কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘটনাবলি পুনরাবৃত্তি সম্ভব হয় না।

২. পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল বস্তুনিষ্ঠ হয়ে থাকে। পর্যবেক্ষকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, পুর্বধারণা, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের ফলাফলের উপর প্রভাব বিস্তার করে।

৩. ইচ্ছা করলেই ঘটনা বা বিষয়বস্তু যখন তখন পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এজন্য পর্যবেক্ষককে ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যা সময় সাপেক্ষ।

৪. এর বড় অসুবিধা হলো প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা কঠিন। কারণ পর্যবেক্ষণ পুনরাবৃত্তি করা যায় না।

৫. প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতাও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায় না ।

৬. এই পদ্ধতিতে চলের কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।

উপসংহার : পরিশেষে বল যায় যে, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে বেশ কিছু অসুবিধা থাকলেও সামাজিক গবেষণায় এ পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যে সকল ক্ষেত্রে গবেষণাগারের কৃত্রিম পরিবেশে তথ্যানুসন্ধান সম্ভব হয় না। যেখানে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে যখন প্রত্যক্ষ করা হয় তখন এ পদ্ধতি একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে পরিণত হয়। তাইতো এ পদ্ধতির ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। অভিজ্ঞ ও দক্ষ পর্যবেক্ষকের সুপরিকল্পিত পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আহরণ করা সম্ভব হয়।

Leave a Comment