সমাজ মনোবিজ্ঞানে অন্তদর্শন পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানে অন্তদর্শন পদ্ধতির ব্যাখ্যা দাও।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের অন্তদর্শন পদ্ধতি সম্পর্কে মূল্যায়ন কর।

উত্তর :  ভূমিকা : অন্তদর্শন মনোবিজ্ঞান তথা সমাজ মনোবিজ্ঞানের একটি অতি প্রচীন পদ্ধতি। দর্শন থেকে মনোবিজ্ঞান পৃথক হবার পর যে পদ্ধতি অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হতো তা হলো অন্তদর্শন পদ্ধতি। উইলহেলম উন্ড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারেও প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তদর্শন পদ্ধতির সাহায্যে পরীক্ষণ পরিচালনা করা হতো। জন বি. ওয়াটসন এ পদ্ধতিকে ব্যক্তিনিষ্ঠ পদ্ধতি বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে অন্তদর্শন পদ্ধতির ব্যবহার কমতে থাকে। অন্তদর্শন পদ্ধতি : অন্তদর্শনের সাহায্যে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের মানসিক জগতে কি ঘটেছে তা সোজাসুজি জানতে পারে। মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞানলাভের জন্য যখন ব্যক্তি নিজের মানসিক প্রক্রিয়াকে জানে তখনই তাকে অন্তদর্শন পদ্ধতি বলে। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে কোনো ব্যক্তি তার নিজের অভিজ্ঞতা পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ বা প্রায়োগিক ভাষায় ব্যক্ত করে থাকে তাকে অন্তর্দর্শন পদ্ধতি বলে। মনোবিজ্ঞান শুরু থেকেই অন্তদর্শন পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে আসছে। অন্তদর্শন চেতনা প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এ পদ্ধতির সাহায্যে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সম্পর্কে জানা যায়। মনোবিজ্ঞান গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ অন্তদর্শন নির্ভর ছিল। মানসিক কার্যকলাপের অধিকাংশই বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এবং যান্ত্রিকভাবেও পরিমাপ করা যায় না। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা পরীক্ষণপত্রের উপর নির্ভর করতে হয়। এভাবে ব্যক্তি নিজের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা করাকে অন্তদর্শন পদ্ধতি বলে। অন্তদর্শন পদ্ধতির সাহায্যে সাধারণ ব্যক্তি তার নিজ অভিজ্ঞতা, সুখ, দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনোভাব, আবেগ, অনুভূতি ইত্যাদি সম্পর্কে গবেষক ব্যক্ত করেন। অন্তদর্শন একটি ব্যক্তিনিষ্ঠ পদ্ধতি, বস্তুনিষ্ঠ নয়। অন্তদর্শনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যক্তি নিজেই তার নিজস্ব অনুভূতি ও মনোভাব ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ ব্যক্তির মধ্যে ঘটমান বিষয় যখন ব্যক্তি তার নিজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পর্যবেক্ষক বা গবেষককে ব্যক্ত করে তাকে অন্তদর্শন পদ্ধতি বলে। সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় অন্তদর্শন পদ্ধতির সুবিধা : এ পদ্ধতির কতিপয় সুবিধা হলো : ১. মনের বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে প্রত্যক্ষভাবে জানার এবং সেগুলোর স্বরূপ ও গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করার উপায় হলো অন্ত-দর্শন। বাহ্যিক পর্যবেক্ষণের সাহায্যে মানসিক প্রক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশকে জানা যায়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ যে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক ক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ, তা জানার একমাত্র উপায় হলো অন্তদর্শন। ২. অন্তদর্শন পদ্ধতিতে ব্যক্তি তার নিজের মানসিক অবস্থা ও ক্রিয়াকলাপ যতখানি সঠিকভাবে জানতে পারে বাহ্যিক পর্যবেক্ষণের আশ্রয়গ্রহণ করে অন্য ব্যক্তির পক্ষে ততখানি জানা সম্ভব নয়। ৩. অন্তদর্শনের জন্য দেশ, কাল, অবস্থা প্রভৃতির উপর নির্ভর করতে হয় না, কোনো ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো স্থান পর্যবেক্ষণ করতে পারে ।  ৪. অন্তদর্শনে তেমন কোনো যন্ত্রপাতি, গবেষণাগার ও অর্থের প্রয়োজন হয় না। ৫. যদি এমনও মনে করা হয় যে, অন্তদর্শনের সহায়তায় পাওয়া মানসিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়, তবুও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাবার জন্য এগুলোকে আনুমানিক সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ALSO READ,

অন্তদর্শন পদ্ধতির অসুবিধা : অন্তদর্শন পদ্ধতির কতিপয় অসুবিধা হলো : ১. অন্তদর্শন পদ্ধতি শুধুমাত্র ব্যক্তির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত বিষয় হওয়াতে নিজেদের সংবেদন এবং প্রতিরূপ ছাড়া অন্য কোনো সংবেদন ও প্রতিরূপ আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। ২. যেহেতু অন্তদর্শন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতি সেহেতু অন্তদর্শনের সাহায্যে দু’জন মনোবিজ্ঞানী একই মানসিক প্রক্রিয়াকে একইভাবে উপলব্ধি করতে কদাচিৎ সক্ষম হন। ৩. অনেক সময় অন্তদর্শন বলতে গেলে অন্তদর্শনের বিষয় অন্তর্হিত হয়ে যায়। ফলে অন্তদর্শন সম্ভব হয় না। আমরা যখন কোনো বিষয়ে তীব্র আবেগের বশীভূত হই (যেমন ভয় বা ক্রোধ) তখন তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোনো ব্যক্তির ক্রোধ হয়েছে এবং তা অন্তদর্শন করতে চান। কিন্তু ক্রোধের সময় অন্তদর্শন সম্ভব হয় না। ৪. এ পদ্ধতিতে আমরা যে মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে পর্যবেক্ষণ করি সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট থাকে। তাছাড়া সব রকম অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে বাদ দিয়ে যে বিশেষ প্রক্রিয়াটিকে আমরা জানতে চাই তার ওপর দৃষ্টি নিবন্ধ করাও অনেক কঠিন। তাই অন্তদর্শন পদ্ধতি সহজসাধ্য নয়। ৫. অন্তদর্শনের ক্ষেত্র খুবই সংকীর্ণ। কেবল পূর্ণবয়স্ক এবং স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে অন্তদর্শন সম্ভব। কিন্তু শিশু ও উন্মাদের জন্য অন্তদর্শন সম্ভব নয়। ৬. ওয়াটসনের মতে অন্তর্দর্শন অবৈজ্ঞানিক ও অনির্ভরযোগ্য। কারণ ব্যক্তিনিষ্ঠ হবার জন্য অন্তদর্শনলব্ধ তথ্য সার্বিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং সুনিশ্চিত নয়। ৭. একই সাথে মনকে অন্তঃমুখী ও বহির্মুখী করা যায় না। একই মনকে দুভাগে ভাগ করে বর্ণনা করা যায় না। উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক পর্যায়ে অধিক প্রচলিত পদ্ধতি হলো অন্তদর্শন। এ পদ্ধতিতে ব্যক্তি তার নিজের মনের মধ্যে ঘটমান বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তার নিজ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলো গবেষকের কাছে ব্যক্ত করেন। তবে এ পদ্ধতির কিছু সুবিধা ও কতিপয় অসুবিধা বিদ্যমান। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অন্তর্দর্শন পদ্ধতি মনোবিজ্ঞানীগণ তেমন একটা ব্যবহার করেন না। তবে মনোবিজ্ঞান গবেষণায় এ পদ্ধতির অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।  

Leave a Comment