সমাজ মনোবিজ্ঞানের সাথে নৃবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানের সাথে নৃবিজ্ঞানের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য আলোচনা কর।

অথবা, নৃ-বিজ্ঞানের সাথে মনোবিজ্ঞানের মিল ও গড়-মিল সম্বন্ধে আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের দু’টি শাখা বিজ্ঞান। এছাড়া দু’টি বিজ্ঞানই মানবিক বিজ্ঞান। সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের আলোচনার প্রধান আকর্ষণ হলো মানুষ। কাজেই এ ধরনের বিজ্ঞান দু’টির মধ্যে পরস্পরিক সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। মানুষের মানবিক প্রবৃত্তি। প্রেষণা, চিন্তা, মনোভাব, চেতনা, চিন্তাধারার নানান প্রতিফল সমাজ মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। অন্যদিকে নৃবিজ্ঞান মানব সমাজের প্রতিটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করে। তাই বিজ্ঞান দু’টির মধ্যে পারস্পরিক সাদৃশ্য বিদ্যমান। বিপরীতক্রমে নানা দিক থেকে এদের মধ্যে বৈসাদৃশ্যও রয়েছে!

নৃবিজ্ঞান ও সমাজ মনোবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক : মানুষ সংক্রান্ত অধ্যয়নের বিজ্ঞান হিসেবে নৃবিজ্ঞান ও সমাজ মনোবিজ্ঞানের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান। নিম্নে সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা হলো :

সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে সাদৃশ্য : নিম্নে সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে সাদৃশ্য তুলে ধরা হলো :

১. বিষয়বস্তুগত সম্পর্ক : মানুষের মানবিক প্রবৃত্তি যেমন চিন্তা-চেতনা, আবেগ, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, প্রভৃতি সমাজ মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়বস্তু। অন্যদিকে নৃবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো মানব সমাজ। মানব সমাজের প্রতিটি ধারার ও ধারণার উদ্ভব ও কার্যাবলি, এবং কার্যকারিতা নিয়ে নৃবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক ও তত্ত্বমূলক আলোচনা করে। অর্থাৎ বিষয়বস্তু গত দিক দিয়ে বিজ্ঞান দু’টি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

২. মানব সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান: সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান উভয়ের আলোচনার কেন্দ্র বা মূলভূমি হলো মানুষ। মানুষের কল্যাণ সাধনই বিজ্ঞান দু’টির প্রধান লক্ষ্য। সমাজ মনোবিজ্ঞানের সূচনাতে নৃবিজ্ঞানের উপর এর ব্যাপক প্রভাবপড়েছিল । কেননা সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান শুধুমাত্র মানুষের প্রয়োজনে উদ্ভব হয়েছে।

৩. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা : কোনো ধরনের মানসিক পরিস্থিতিতে মানুষ কোনো কোনো আচার অনুষ্ঠান বিশ্বাস সংস্কার প্রচলন করেছে এ বিষয়গুলো বিচার করতে মনোবিজ্ঞানের সাহায্য অপরিহার্য বলে নৃবিজ্ঞানে বিবেচিত হয়। নৃবিজ্ঞানকে মানুষের চিন্তা ধারা বিচার বিশ্লেষণে মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতির উপর নির্ভর করতে হয়। তেমনিভাবে সামাজিক জীব হিসেবে মানুষে উৎপত্তি, মানব দেহের গঠন কাঠামো, ফসল প্রভৃতি সম্পর্কে জানতেও সমাজ মনোবিজ্ঞান নৃবিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল।

৪. তথ্যগত মিল : নৃবিজ্ঞান মানুষের কৃষ্টি ও সভ্যতা সম্পর্কে যে তথ্য সরবরাহ করে তা সমাজ মনোবিজ্ঞানের অনেক সমস্যা বিশ্লেষণে আলোকপাত করে। যেমন ব্যক্তিত্ব, মনোভাব, বিশ্বাসের উপর কৃষ্টির প্রভাব অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আদিম সমাজ সম্পর্কিত নৃবিজ্ঞানীগণের গবেষণালব্ধ তথ্য বেশ সহায়তা করে। আবার আদিম সমাজে অন্ধবিশ্বাস, জীবনাচার, অনুষ্ঠান, আচার-আচরণ ধর্মীয় কার্যকলাপ ইত্যাদিনৃতাত্ত্বিক বিষয়ের উপর সমাজ মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে।

৫. প্রধান আলোচ্য বিষয়: সমাজ মনোবিজ্ঞান ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানের আলোচনার প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সমাজ মানুষের বিশ্বাস, মনোভাব, মানুষের আচরণ, মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয়বস্তু।

৬. সমস্যা সমাধান ও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি : সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ জীবনে মানুষের নানান সমস্যার সমাধান করতে সচেষ্ট থাকে। মূলত মানুষের কল্যাণ সাধন বিজ্ঞান দু’টির প্রধান লক্ষ্য, অন্যদিকে কিভাবে পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সুস্পর্ক বজায় থাকে তা সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান আলোচনা করে।

সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে বৈসাদৃশ্য : নিম্নে সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে কতিপয় বৈসাদৃশ্য তুলে ধরা হলো :

১. সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত, জনগোষ্ঠীর আচরণের বৈশিষ্ট্য, কিভাবে জরুরী অবস্থা মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু একজন সমাজ মনোবিজ্ঞানী সামাজিক গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত আচরণ ও মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। কাজেই আলোচনার দিক দিয়ে পরস্পরের মধ্যে বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।

২. একজন সমাজ মনোবিজ্ঞানী তার আলোচ্য বিষয় হিসেবে মানুষের আচরণকে নিয়ে আলোচনায় বেশি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু একজন নৃবিজ্ঞানী যখন মানুষকে নিয়ে আলোচনা করে তখন তিনি মানুষের  উৎপত্তি, ফসল ও খনন কার্যে বেশি প্রাধান্য দেন । এছাড়া বিভিন্ন সময়ের মানুষের কৃষ্টি ও সভ্যতার উৎপত্তি নিয়েও আলোচনা করে ও প্রাধান্য দেয়।

৩. সমাজ মনোবিজ্ঞানের অন্যতম বিষয়বস্তু হলো সমাজ ও সমাজের মানুষ। কিন্তু নৃবিজ্ঞানের প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের সাথে সাথে অন্যান্য প্রাণী কৃতির সাথে সংগ্রাম করে কিভাবে টিকে আছে এবং সেসব প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেনই বা তারা বিলুপ্ত হলো ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এসব বিষয় নিয়ে সমাজ নৃ-বিজ্ঞান আলোচনা করে।

৫. সমাজ মনোবিজ্ঞান ব্যক্তির সামাজিক আচরণ নিয়ে অধ্যয়ন করে। একই কিংবা বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে মানুষ কিভাবে প্রতিক্রিয়া করে তাও সমাজ মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে। কিন্তু নৃবিজ্ঞান শুধুমাত্র মানুষের ক্রমবিকাশ ও বর্তমান কিভাবে এর কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা করে।

৬. সমাজ মনোবিজ্ঞান গোষ্ঠীর বর্তমান আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। এখানে অতীতের আলোচনা গৌণ। কিন্তু নৃবিজ্ঞানে অতীতের আলোচনায় মুখ্য। এজন্য নৃবিজ্ঞান শুধু বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত না থেকে অতীত বিভিন্ন ঘটনা কাঠামো নিয়েও আলোচনা করে। অর্থাৎ মানব গোষ্ঠীর অতীত উৎপত্তি নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মধ্যে পারস্পরিক কতিপয় পার্থক্য থাকলেও পরস্পরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। কারণ নৃবিজ্ঞান ও সমাজ মনোবিজ্ঞানের যৌথ আলোচনা ব্যতীত মানুষ সংক্রান্ত আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কাজেই এ বিজ্ঞান দু’টি পরস্পরের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল এবং প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে তারা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

Leave a Comment