সংক্ষেপে জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্বরূপ আলোচনা কর।

অথবা, জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্বরূপ বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানে জীবিত প্রাণীর আচরণ নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন— শারীরিক গঠন, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র, প্রভৃতি উপাদান বিশেষভাবে প্রভাববিস্তার করে। তাই মনোবিজ্ঞানকে জৈবিক বিজ্ঞান বলে। আবার আচরণ কেবল জৈবিক বৈশিষ্ট্যবলির দ্বারাই প্রভাবিত হয় না সামাজিক পরিবেশ দ্বারাও প্রভাবিত হয়ে থাকে। মানুষ যে সমাজে বসবাস করে তার প্রচলিত রীতিনীতি, মূল্যবোধ বিশ্বাস ও কৃষ্টি দ্বারা যে প্রভাবিত হয়। তাই মনোবিজ্ঞানকে সামাজিক বিজ্ঞান বলা হয়। অর্থাৎ আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক ঘটনাবলির পাশাপাশি সামাজিক প্রভাব ও রয়েছে। তাই মনোবিজ্ঞানকে জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান বলা যায় ।

জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্বরূপ :

১. মনোবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জীবন্ত প্রাণীর আচরণ। এ দিক থেকে মনোবিজ্ঞানকে জীববিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাণীর আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক ঘটনা বা বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন- শারীরের গঠন জৈব রাসায়নিক উপাদান প্রভৃতি এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের জন্যই আচরণের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

২. প্রাণীর আচরণ শুধু তার জৈবিক ঘটনাবলি দ্বারাই প্রভাবিত নয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও প্রাণীর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বন্য প্রাণীরা যেমন- আরণ্যের পরিবেশে বাস করে, মানুষও তেমনি মনুষ্য সমাজে বাস করে। একজন মানুষের আচরণ যেমন অন্যজনের আচরণকে প্রভাবিত করে। তেমনি অন্যের আচরণ দ্বারাও সে প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ পারস্পরিকতার সম্পর্ক মানুষের আচরণের উপর প্রভাববিস্তার করে থাকে। মানুষ যে সমাজে বাস করে তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণ সেই সমাজের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সমাজের রীতি-নীতি, সংস্কৃতি দ্বারা ব্যক্তির আচরণ প্রভাবিত হয়। তাই মনোবিজ্ঞানকে সমাজবিজ্ঞানেরও একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়।

৩. প্রাণীর আচরণসমূহ তার জৈবিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। যেমন- মস্তিষ্কের পরিপূর্ণতার ফলে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। হাইপোথ্যালামাস ব্যক্তির আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, নালীহীন গ্রন্থিসমূহ আমাদের দেহে এবং আচরণে পরিবর্তন সৃষ্টিই করে। সুতরাং জৈবিক ঘটনাবলি দ্বারাই প্রাণীর আচরণসমূহ সৃষ্টি হয়।

৪. প্রাণীর আচরণে পারিপার্শ্বিক অবস্থাও প্রভাব ফেলে। বন্য প্রাণী বনে জঙ্গলে বসবাস করে, মানুষ বসবাস করে সমাজে। বন্য প্রাণীরা বনে জঙ্গলে থেকে বাঁচে। আর মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো সমাজের সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধ সৃষ্টি করে। মানুষের আচরণে মনোবিজ্ঞানীরা সামাজিক প্রভাবসমূহ পর্যবেক্ষণ করেন।

৫. বন্য প্রাণীরা বন জঙ্গলের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে। তৃণভোজী প্রাণীরা তৃণভোজের কাছাকাছি বাস করে। নিজেকে রক্ষার জন্য তারা তীব্র মানশক্তি, তীব্র শ্রবণশক্তি ও গতিশক্তি সম্পন্ন হয়। মাংসের লোভে কৌশলে পথচলা, ভীরু প্রাণীদের ধোঁকা দেয় সবই তারা তাদের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ারই প্রয়াস। অর্থাৎ প্রাণীর প্রয়োজনে প্রাণীকে দরকার। তেমন মানুষ ও একাকী বাস করতে পারেন। এতে করে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্জন থাকলেও ব্যক্তির মধ্যে সমাজের প্রভাব পড়ে। ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলতে হলে সমাজ থেকে শিক্ষা, আদর্শ, মূল্যবোধ নিতে হয়। আর এজন্য সামাজিক প্রভাব ব্যক্তির উপর বর্তমান।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান একটি যথার্থ বিজ্ঞান। কারণ মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিজ্ঞানের সকল বৈশিষ্ট্যেই মনোবিজ্ঞানে প্রতিফলিত হয়। মনোবিজ্ঞানকে অন্যান্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ন্যায় যথার্থ বিজ্ঞান হিসেবে এ অভিহিত করা হয়। তাই মনোবিজ্ঞান একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবেও পরিচিত।

Leave a Comment