মনোবিজ্ঞান ব্যবহৃত যে কোনো তিনটি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা কর

মনোবিজ্ঞান ব্যবহৃত যে কোনো তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশদ বিবরণ দাও।

উত্তর : 

ভূমিকা: মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো পৃথক পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতিগুলো সাধারণত একটির সাথে অন্যটির সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু আলোচনা করার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। আচরণ সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান হিসেবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য মনোবিজ্ঞানে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাধারণত কোনো বিষয়বস্তুর মাধ্যমে সেই বিষয়ে গবেষণা করা হয় তার উপর। মনোবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এ সকল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে। মনোবিজ্ঞান বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ : মনোবিজ্ঞান হচ্ছে আচরণের বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞানের গবেষণা ক্ষেত্রে প্রধানত নিম্নলিখিত পদ্ধতিসমূহ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা:

১. অন্তদর্শন পদ্ধতি; 

২. পরীক্ষণ পদ্ধতি; 

৩. পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি; 

৪. পরিসংখ্যান পদ্ধতি; 

৫. চিকিৎসা পদ্ধতি

৬. জরিপ পদ্ধতি এবং 

৭. কেস স্টাডি পদ্ধতি।

এগুলো থেকে মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত যে-কোনো তিনটি পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। যথাঃ

(ক) পরীক্ষণ পদ্ধতি : মনোবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে। মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহের মধ্যে পরীক্ষণ পদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি মনে করা হয় এবং মনোবৈজ্ঞানিক অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে পরীক্ষণ পদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে । যে পদ্ধতিতে সুব্যবস্থিত ও সুপরিকল্পিত অবস্থায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাপেক্ষ চলের ওপর স্বাধীন চলের প্রভাব যাচাই করা হয় তাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি বলে।

গ্রামাণ্য সংজ্ঞা : পরীক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্ন প্রকার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। সেগুলো নিচে দেয়া হলো।

Barry. F. Anderson বলেছেন, “পরীক্ষণ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কেউ দুটি চলের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য একটির মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন এনে দেখেন এর সাথে অন্যটির মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধন হয় কি-না।”

Wayne Weiten এর মতে, “পরীক্ষণ হলো এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি যেখানে অনুসন্ধানকারী সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি চল প্রয়োগ করেন এবং তার সাথে দ্বিতীয় চলে কোনো পরিবর্তন আসে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করেন।”

পরীক্ষণ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য : পরীক্ষণ পদ্ধতির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো । যথা- উডয়ার্ন এবং শ্লোজবার্গ (১৯৫৪) পরীক্ষণ পদ্ধতির নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন।

১. পরীক্ষক পর্যবেক্ষণীয় ঘটনাটি যখন খুশি তখনই সৃষ্টি করতে পারে না, সুতরাং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি প্রস্তুত থাকেন।

২. তিনি একই রকম অবস্থা যতবার খুশি পুনরুৎপাদন করে ফলাফল যাচাই করতে পারেন ।

৩. তিনি কতকগুলো অবস্থার পরিবর্তন বা হ্রাস-বৃদ্ধি করে ফলাফলের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন।

পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধাঃ পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধাসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো। যথা:

১. বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা হচ্ছে যে পরীক্ষণ পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে থাকে। এর ফলে ফলাফল বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে থাকে। সুতরাং পরীক্ষণ পদ্ধতি অনেক বেশি বিজ্ঞান নির্ভর।

২. চলের নিয়ন্ত্রণ: পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা হচ্ছে চলের নিয়ন্ত্রণ। পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে চলের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা হয় বলে কোনো অবাঞ্ছিত চল পরীক্ষণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

৩. চলের পরিবর্তন : পরীক্ষণ পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হচ্ছে চলের পরিবর্তন। অর্থাৎ পরীক্ষণ পরিবেশে চলের নিয়ন্ত্রণ থাকে বলে পরীক্ষক ইচ্ছামত চলের পরিবর্তন করে থাকে ।

৪. পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি : পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি এর মাধ্যম কোনো বিষয়ের উপর বার বার পরীক্ষণ কার্য পরিচালনা করা যায়। সময় স্থান ভেদে পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি করা যায়।

৫. পরীক্ষণের ফলাফল সঠিক ও সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ: পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে ফলাফল সংক্ষিপ্ত ও সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় । এই পদ্ধতির ফলাফল ব্যক্তিদোষে দুষ্ট হতে পারে না। সেজন্য ফলাফল অধিক নির্ভরযোগ্য হয়।

৬. সাধারণীকরণ : পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে ফলাফলের সাধারণীকরণ করা যায়। অল্পসংখ্যক দৃষ্টান্ত থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া যায়।

পরীক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : পরীক্ষণ পদ্ধতির কিছু পরিমাণে সুবিধা থাকলেও এই পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো।

১. পরীক্ষণপাত্রের সাহায্যহীনতা : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি অসুবিধা হচ্ছে যে, পরীক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষণপাত্র অনেক সময় পরীক্ষককে গবেষণাক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগিতা নাও করতে পারে।

২. বাহ্যিক গবেষণার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সকল ঘটনা পরীক্ষণ কেন্দ্রে করা হয়। এক্ষেত্রে গবেষণাগারে যেসব ঘটনা সৃষ্টি করা যায় না সেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয়। যেমন- দাঙ্গাকারী জনতার মিছিল ইত্যাদি।

৩. কৃত্রিম পরিবেশ : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম ত্রুটি হলো কৃত্রিম পরিবেশ। পরীক্ষণ পদ্ধতিতে কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি করে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। কৃত্রিম পরিবেশে এসে জীব স্বাভাবিক আচরণ নাও করতে পারে। এতে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।

৪. যন্ত্রপাতির দুষ্প্রাপ্যতা : উপযুক্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় গবেষককে যন্ত্রপাতির জন্য অপেক্ষা করতে হয় যা গবেষণার বিলম্ব ঘটিয়ে থাকে।

৫. নিয়মকানুনের কঠোরতা : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে পরীক্ষককে কঠোর নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। এতে করে গবেষণার কাজে সমস্যা হয়ে থাকে।

৬. গবেধকের প্রভাব : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে যেহেতু গবেষক সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। কাজেই গবেষক ও পরীক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

(খ) পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিকে বিষয়গত পদ্ধতিও বলা হয়। বহু আগে থেকেই মনোবিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবেষণায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো এক বা একাধিক ঘটনার সামনে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা:

V. Young বলেন, “দৃশ্যমান বিষয়কে সুশৃঙ্খলভাবে দেখাকেই পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।”

The Concise Oxford Dictionary-তে বলা হয়েছে- “পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক বা কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে সংঘটিত বিষয়াবলি সঠিকভাবে লক্ষ্য করা এবং রেকর্ড করা।”

সুতরাং কোনো ঘটনাকে মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষ করে যে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে সেই পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে।

বৈশিষ্ট্য : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথা

১. সরাসরি প্রত্যক্ষণ : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো সরাসরি প্রত্যক্ষণ। অর্থাৎ এমন অনেক আচরণ আছে যেগুলোকে সরাসরি বর্ণনা দেয়া যায় না। এ আচরণগুলোকে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে সরাসরি প্রত্যক্ষণ করা যায় ।

২. পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যকারী : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মৌলিক উপাত্ত সৃষ্টির সাহায্যে পরীক্ষণ পদ্ধতিকে সাহায্য করে থাকে। কারণ পরীক্ষণলব্ধ জ্ঞান বাস্তবে কার্যকর কি না তা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে তা জানা যায় ।

৩. সাংকেতিকরণ করা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে যে সকল ঘটনাকে ধারণ করা যায় সেগুলোকে যথাযথভাবে সম্পাদনার মাধ্যমে সাংকেতিকরণ করা হয়।

৪. পূর্ব অভীক্ষকের ভূমিকা : জরিপ বা অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি পূর্ব অভীক্ষা হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে ।

সুবিধা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কিছু কিছু সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথা

১. মানসিক অবস্থা জানা যায় : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সাধারণত অন্য ব্যক্তির মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। অন্য ব্যক্তির মনকে জানতে না পারলে মন সম্পর্কীয় সঠিক নিয়ম আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। এ জন্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

২. সকল আচরণ আয়ত্তাধীন : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সব ধরনের আচরণ সম্পর্কে জানা যায়। মানুষের বাহ্যিক আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষের সম্পর্কে জানা যায়।

৩. তথ্য পরিসংখ্যানের ভাষায় প্রকাশ : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে সাধারণত সংগৃহীত তথ্যগুলোকে সাধারণত পরিসংখ্যানের ভাষায় প্রকাশ করা যায়।

৪. স্বাভাবিক পরিবেশে পর্যবেক্ষণ : যে সব আচরণ যেমন পরিবেশ পরিস্থিতিতে ঘটেছে তা জানা যায় পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে। স্বাভাবিক পরিবেশে তথ্য ভালভাবে জানতে পারা যায়।

৫. সঠিক আচরণ জানা যায় : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সাধারণত মানুষ ও প্রাণীর সঠিক আচরণটি সম্পর্কে জানা যায়।

৬. পরীক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি পরীক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে।

অসুবিধা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

১. ব্যক্তিনিষ্ঠ ফলাফল : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির প্রধান অসুবিধা হলো ফলাফলের ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রভাব। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে ফলাফল অনেকটা ব্যক্তিনিষ্ঠ হয়ে থাকে।

২. ইচ্ছামত পর্যবেক্ষণ : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে কোনো একটা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছা করেছে তৎক্ষণাৎ তা সৃষ্টি করে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। বরং তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

৩. তথ্যের যথার্থতা যাচাই : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সাথে যে তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, তার যথার্থতা যাচাই করা অনেক কঠিন কাজ। এটি একটি বড় ত্রুটি।

৪. চলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের যে চল থাকে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

৫. আচরণ বোঝা কষ্টকর: পর্যবেক্ষণের সাথে অনেক সময় আচরণ বোঝা কষ্টকর হয়ে থাকে। কারণ কষ্টে অনেক মানুষ হাসে আবার কাঁদে।

৬. কৃত্রিম আচরণে প্রয়োজনহীন : কোনো ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণের সময় সেই ব্যক্তি যদি কৃত্রিম আচরণ করে তা হলে তার ভিতরের সত্য তথ্য জানা যায় না।

(গ) অন্তদর্শন পদ্ধতি : অন্তদর্শন পদ্ধতি একটি প্রাচীন পদ্ধতি। মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তদর্শন পদ্ধতি ছিল মূল ব্যবহৃত পদ্ধতি। সাধারণভাবে বলা যায় যে মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য যখন ব্যক্তি নিজের মানসিক প্রক্রিয়াকে জানে তখনেই তাকে অন্তর্দর্শন বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্নভাবে অন্তদর্শন পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন সেগুলো নিচে দেয়া হলো।

Knight and Knight বলেন, “ব্যক্তি যখন তার মানসিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ ও গতি প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করে তখন তাকে অন্তদর্শন পদ্ধতি বলে।”

Stout-এর মতে, “অন্তর্দর্শন হলো নিজের অভিজ্ঞতার প্রতি মনোযোগী হওয়া।”

সুতরাং এ পদ্ধতির সাহায্যে ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়াসমূহ সরাসরি জানতে পারে ।

সুবিধা : অন্তদর্শন পদ্ধতির কিছু কিছু সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা—

১. গবেষণায় বিশেষ উপযোগী : অন্তদর্শন পদ্ধতিটি সংবেদন, প্রত্যক্ষণ, আবেগ ও চিন্তা সম্পর্কিত গবেষণায় বিশেষ উপযোগী।

২. পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির পরিপূরক : অন্তদর্শন পদ্ধতিটি পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণলব্ধ পদ্ধতির পরিপূরক হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।

৩. পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির তথ্যের ব্যাখ্যা : অন্তদর্শন পদ্ধতিটি পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহার করা যায়।

৪. ইচ্ছানুযায়ী পর্যবেক্ষণ : কোনো ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো স্থানে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

৫. মানসিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ : অন্তদর্শন পদ্ধতির সাহায্যে ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ সম্পর্কে জানা যায় ।

অসুবিধা : অন্তর্দর্শন পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ নিচে দেয়া হলো। যথা

১. ব্যক্তিকেন্দ্রিক : অন্তদর্শনের সাহায্যে দুজন মনোবিজ্ঞানী একই সাথে মানসিক প্রক্রিয়াকে একত্রভাবে পর্যবেক্ষণ করতে কখনই সক্ষম হন না।

২. ক্ষেত্রসীমিত : অন্তদর্শনের ক্ষেত্র খুবই সীমিত। কেবল পূর্ণবয়স্ক ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে অন্তদর্শন সম্ভব।

৩. সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ : সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অন্তর্দর্শন পদ্ধতিক প্রয়োগ না করা হলে সাধারণত যথার্থ তথ্য পাওয়া যায় না।

৪. অবৈজ্ঞানিক : অন্তর্দর্শন পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক। কারণ ব্যক্তিনিষ্ঠ হবার জন্য অন্তর্দর্শনলব্ধ তথ্য সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও সুনিচ্ছিত নয় ।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ অন্যতম। সব পদ্ধতির কিছু না কিছু সুবিধা রয়েছে আবার তাদের কিছু কিছু অসুবিধাও রয়েছে। পরীক্ষণ পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বলা হয় কারণ পরীক্ষণ পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নিয়ম-কানুন অনুসন্ধান করে থাকে। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাভাবিক পরিবেশে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। তবে এখানে কোনো বাহ্যিক চলের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অন্তদর্শনের সাহায্যে মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায় তবে এর ক্ষেত্র সীমিত।

Leave a Comment