মনোবিজ্ঞান কি? আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি বর্ণনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ? আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি আলোচনা কর।

উত্তর :  ভূমিকা ; দর্শনের ইতিহাসে যেমন প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক যুগ রয়েছে তেমনি মনোবিজ্ঞানেরও পর্যায় রয়েছে। এ পর্যায়ের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে আধুনিক মনোবিজ্ঞান আসে। সুতরাং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি থাকাটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মনোবিজ্ঞান একটি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বেশ পরিচিত লাভ করেছে। কোনো জিনিসই এক দিনে সমৃদ্ধ হতে পারে না। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে মনোবিজ্ঞান নিজেকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে উন্নীত করেছে।

মনোবিজ্ঞান : খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর সাহিত্য ও দর্শনে ‘মনোবিজ্ঞান’ শব্দটি পাওয়া যায়। মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Psychology। দুটি গ্রিক শব্দ Psyche এবং Logos থেকে ইংরেজি Psychology শব্দটির উৎপত্তি। Psyche অর্থ মন বা আত্মা এবং Logos শব্দের অর্থ বিজ্ঞান বা প্রজ্ঞা। শব্দগত অর্থে মনোবিজ্ঞান হচ্ছে মনের বিজ্ঞান ।  ১৮৭৯ সালে উইলহেম উন্ড বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো চেতনার বিজ্ঞান।” আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন ১৯১৩ সালে মনোবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা প্রদান করেন। তার মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান।” রডিজার ও তাঁর সঙ্গীদের (১৯৮৪) মতে, “মনোবিজ্ঞানকে আচরণ ও মানব জীবনের সংগঠিত অনুধ্যান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।” ক্রাইডার ও তাঁর সঙ্গীদের (১৯৯০) মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াসমূহের বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনা।”

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি : আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি আলোচনার জন্য মনোবিজ্ঞানের বিকাশধারা আলোচনা করা আবশ্যক। মনোবিজ্ঞানের বিকাশ স্তর কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। তা  নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

প্রথম পর্যায় : গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আত্মা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।”

দ্বিতীয় পর্যায় : জার্মান মনোবিজ্ঞানী ড: উইলহেনস উত্তের মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো একটি চেতনার বিজ্ঞান।”

তৃতীয় পর্যায় : আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী জে. বি. ওয়াটসন ১৯১৩ সালে ‘Psychology as the behaviourist views it’ নামক প্রবন্ধে যুক্তির সাথে উল্লেখ করেন যে, মনোবিজ্ঞান মানুষ ও প্রাণীর আচরণের বিজ্ঞান। তাঁর এ মতে প্রভাবিত হয়ে অনেকে মনোবিজ্ঞানকে আচরণের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন : ই. আর. হিলগার্ড বলেন, “মনোবিজ্ঞানকে এমন বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে অনুধ্যান করে।”

ALSO READ,

চতুর্থ পর্যায় : বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অনেক মনোবিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন যে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া। যেমন: ক্রাইডার ও তাঁর সহযোগীদের মতে, “আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান হিসেবে মনোবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।” উপরোক্ত সংজ্ঞার মাধ্যমে সংজ্ঞাগত দিক থেকে মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি সম্পর্কে জানা হলো। এছাড়া এ মনোবিজ্ঞানের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মনোবিজ্ঞান ধীরে ধীরে বিজ্ঞান হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে। এর পিছনে ক্রমান্বয়ে কিছু পটভূমি রয়েছে। যেমন:

১. আচরণ : প্রাণীর ক্রিয়া প্রক্রিয়াকে আচরণ বলা হয়। মনোবিজ্ঞানীগণ আচরণকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অনুধ্যান করে থাকেন। কথা বলা, খাদ্য গ্রহণ, খেলা করা ইত্যাদি সবই আচরণ। তাছাড়া শারীরিক পরিবর্তন যেমন- রক্তচাপ, মস্তিষ্কের তড়সা প্রভৃতি আচরণের মধ্যে পড়ে।

২. মানসিক প্রক্রিয়া : মানসিক প্রক্রিয়া হলো চিন্তন, স্মৃতি, প্রেষণা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা ইত্যাদি। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে মানসিক প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে অনুধ্যান করার সক্ষমতা লক্ষণীয়।

৩. মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন পরীক্ষাকার্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে পরীক্ষার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এমন অনেক পরীক্ষা আছে যা মানুষের মৃত্যুও ঘটাতে পারে সেক্ষত্রে মনোবিজ্ঞানীগণ ইঁদুর প্রাণীকে ব্যবহার করেন।

৪. বিজ্ঞান : বিজ্ঞান বলতে বুঝায় কোনো ঘটনা বা বস্তুর সুনিয়ন্ত্রিত ও সুসামঞ্জস্য জ্ঞান। মনোবিজ্ঞান নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি প্রয়োগ করে আচরণের উপর উপাত্ত সংগ্রহ করে এবং উপাত্তের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে। আর তাই এই জ্ঞান সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। আর মনোবিজ্ঞানীগণ তাঁদের মতের মাধ্যমে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি প্রকাশ করে। তা নিম্নে দেয়া হলো :

উইলহেম উন্ড : উইলহেম উন্ড কাঠামোবাদের, নীতিগুলো প্রণয়ন করেন এবং তাঁর ছাত্র আমেরিকার বার্গের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এনওয়ার্ড টিচেনার কাঠামোবাদের উন্নয়ন ঘটান। এ মতবাদ অনুযায়ী মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হলো চেতনা। চেতনা অভিজ্ঞতা অনুধ্যানের জন্য উন্ডের অনেক সুখ্যাতি রয়েছে যা অন্তদর্শন নামে পরিচিত। উইলিয়াম জেমস : জেমস ছোট ছোট পরীক্ষাগার স্থাপন করে মনোবিজ্ঞানে কৃতিত্ব রেখেছেন।

এরিস্টটল: গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল সর্বপ্রথম অনুষঙ্গবাদের সূত্রপাত করেন। মতবাদ হিসেবে অনুষঙ্গবাদ বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও নীতি হিসেবে তা মনোবিজ্ঞানে বিশেষ স্থান লাভ করেছে।

ওয়াটসন : জে. বি. ওয়াটসন আচরণবাদের প্রবর্তন করেন। তিনি মনোবিজ্ঞান থেকে অন্তদর্শনকে বাদ দেন। তিনি মন শব্দের পরিবর্তে মানুষের বাহ্যিক আচরণকেই মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন।

সগমন্ড ফ্রয়েড : ফ্রয়েড মনঃসমীক্ষাবাদের প্রবর্তক। তিনি মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে মনঃসমীক্ষা নামে এক অভিনব চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব মতবাদে ব্যক্তিত্বের গঠন, বিকাশ ও গতিশীলতা বিষয়ের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেন।

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায় যে, কোনো কিছুই একদিনে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে পারে না। তেমনি মনোবিজ্ঞানও গবেষণা, বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় প্রক্রিয়াকরণের পর আধুনিক মনোবিজ্ঞানে আবির্ভূত হয়েছে। তাই মনোবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment