“মনোবিজ্ঞান একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান” উক্তিটি ব্যাখ্যা কর

অথবা, “মনোবিজ্ঞান একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান” এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানকে একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষত মনোবিজ্ঞান জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে অধিক পরিচিতি লাভ করেছে। বিজ্ঞান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘বিশেষ জ্ঞান’ । যে কোনো বিশেষ শ্রেণির বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে যথাযথ ও সুসংবদ্ধ জ্ঞানকে বলা হয় বিজ্ঞান। অর্থাৎ সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত কোনো বস্তু বা ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে আমরা যে বিশেষ জ্ঞান লাভ করি তাই বিজ্ঞান। সার্বিক বিবেচনায় মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করা যায়। 

জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞান : কোনো বিষয় বিজ্ঞান কিনা তা নির্ভর করে পাঁচটি বিষয়ের উপর। যথা 

(ক) বিষয়বস্তু 

(খ) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি 

(গ) বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি 

(ঘ) প্রয়োগশীলতা 

(ঙ) ভবিষ্যদ্বাণী । 

নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

(ক) বিষয়বস্তু : সব বিজ্ঞানের একটি স্বীকার্য এই যে, বিজ্ঞান যে বস্তু বা ঘটনার অনুধ্যান করে তা নিয়ম সাপেক্ষ। তাছাড়া বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে । যথা –

১. বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু পরীক্ষণযোগ্য হতে হবে।

২. বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে গবেষকগণ একে অপরের সাথে ভাষার সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।

৩. বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু পরিমাপযোগ্য হতে হবে। মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যের সাথে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই বিষয়বস্তুর দিক থেকে মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান বলা যায় ।

(খ) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি : বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার গবেষণা পদ্ধতি। গবেষণা যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নিয়ম অনুসারে করা হয় তাহলে তাকে বিজ্ঞান বলা যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কতগুলো নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যথাঃ

১. কার্যকরি সংজ্ঞা

২. ব্যক্তি নিরপেক্ষতা

৩. নিয়ন্ত্রণ

৪. পূনরাবৃত্তি

৫. সাধারণীকরণ

৬. যথার্থতা প্রমাণ

৭. পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ

৮. মাপকের ব্যবহার।

মনোবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করে চলে।

১. কার্যকরি সংজ্ঞা প্রদান: যে বিষয়ের উপর অনুধ্যান করা হচ্ছে তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা বা নির্দেশ করাই হচ্ছে কার্যকরি সংজ্ঞা প্রদান। যখন বৈজ্ঞানিক কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে গবেষণা করেন তখন তিনি উক্ত বিষয়ের একটি কার্যকরি সংজ্ঞা প্রদান করেন।

২. ব্যক্তি নিরপেক্ষতা মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রাণীর আচরণ এবং এই আচরণ ব্যক্তি নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রাণীর এই আচরণ কোনো গবেষক যেভাবে অনুসন্ধান করতে পারেন, নিরপেক্ষতার কারণে অন্যরাও অনুরূপ করতে পারেন।

৩. নিয়ন্ত্রণ : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রণ। পরীক্ষণ পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তাকে বিজ্ঞানসম্মত অনির্ভরশীল চল প্রয়োগে নির্ভররশীল চলে কি পরিবর্তন আসে তা লক্ষ্য করা হয় এবং পরীক্ষণ পরিস্থিতিকে বাহ্যিক চলের প্রভাবমুক্ত রাখা হয়। এভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে পরীক্ষণ পরিচালনা করা হয়।

৪. পুনরাবৃত্তি : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো পূর্বে পরীক্ষিত কোনো বস্তু বা পরিবেশ পুনরায় সৃষ্টি করে গবেষণাকার্য পরিচালনা করা। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায়ও বিজ্ঞানের এ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

৫. সাধারণীকরণ : অল্প সংখ্যক দৃষ্টান্ত থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়াকে সাধারণীকরণ বলে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণার গবেষক মানুষ বা প্রাণীর একটি প্রতিনিধিত্বমূলক দলের উপর গবেষণা প্রাপ্তি তথ্যের ভিত্তিতে সব মানুষ তা প্রাণী সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব বা সূত্র প্রণয়ন করেন।

৬. যথার্থতা প্রমাণ : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যথার্থতা প্রমাণ। কোনো বিজ্ঞানীক তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করার পর অন্যান্য বিজ্ঞানীকগণ তা হুবুহু যাচাই করতে চান। এ প্রকিয়াকে যথার্থতা প্রমাণ বলে।

৭. পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ : সংগৃহীত তথ্যসমূহকে পরিসংখ্যানের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে তা যাচাই করা এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য । মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যকে বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যানিক পরিমাপের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয়।

৮. মাপকের ব্যবহার : বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আদর্শয়ায়িত বিভিন্ন ধরনের মাপক ব্যবহার করা হয়। মনোবিজ্ঞানে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের জন্য অনেক মাপক রয়েছে। যেমন বুদ্ধি পরিমাপনের জন্য বিনে-সিমো স্কেল, প্রবণতা মাপনের জন্য ডি. এ.টি মাপক ব্যবহার করা হয়।

(গ) বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : বিজ্ঞানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দৃষ্টিভঙ্গি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টভঙ্গি বলতে বোঝায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বহির্ভূত জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে না থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়কে বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা। এতে তত্ত্ব ও তথ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানীর থাকতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানীগণ পুরাতনকে বর্জন করে নিত্য নতুন তথ্য আহ্বানে সদা নিয়োজিত। প্রাথমিক পর্যায়ে মনোবিজ্ঞানকে আত্মা বা মনের বিজ্ঞান বলা হত। কিন্তু বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয় হেতু আত্মা বা মনকে বাদ দিয়ে আচরণ বা মানসিক প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তেমনি ভাবে মনোবিজ্ঞানেরও পুরাতনকে বাদ দিয়ে নতুনকে গ্রহণের মানসিকতা রয়েছে ।

(ঘ) প্রয়োগশীলতা : বিজ্ঞানের আর একটি মাপকাঠি হলো এর প্রয়োগ বা ব্যবহার। যে বিষয় বা ঘটনা বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় না তাকে বিজ্ঞান বলা যাবে না। মনোবিজ্ঞানের গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য বা সূত্র জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকরিভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের আজ বহুমুখী প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। শিল্প, কলকারখানা, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ, ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় জীবন প্রভৃতি প্রায় সর্বক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

(ঙ) ভবিষ্যদ্বাণীকরণ : ভবিষ্যদ্বাণী বিজ্ঞানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো পরীক্ষালদ্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করা। মনোবিজ্ঞানের মূল বিষয় হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মনোবিজ্ঞানীগণও আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ জীবনে মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করতে যতই মনোবিজ্ঞানীগণ এগিয়ে চলছেন ততই মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করার যথার্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষকে ব্যাখ্যা করার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ যেমন একদিকে জৈবিক প্রক্রিয়াকে বাদ দিতে পারেন না, তেমনি সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের আচরণের বিষয়টিকেও এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই মনোবিজ্ঞান বর্তমানে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

1 thought on ““মনোবিজ্ঞান একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান” উক্তিটি ব্যাখ্যা কর”

Leave a Comment