মনোবিজ্ঞান অনার্স ১ম বর্ষের ভূমিকার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও রচনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন

মনোবিজ্ঞানের ইংরেজী প্রতিশব্দ কি?

উত্তর : Psychology.

মনোবিজ্ঞানের একটি সংজ্ঞা দাও।

উত্তর : মনোবিজ্ঞান হল আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াসমূহের বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনা।

Psychology শব্দটির কোথা থেকে এসেছে?

উত্তর : গ্রীক শব্দ ‘Psyche’ এবং ‘Logos’ থেকে এসেছে।

‘Psychology’ শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ কি?

উত্তর : শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হলো-আত্ম বা মন সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।

‘Principles of Psychology’-গ্রন্থের লেখক কে?

উত্তর : ‘Principles of Psychology’-গ্রন্থের লেখক উইলিয়াম জেমস।

‘Psyche’ ও ‘Logos’ শব্দের অর্থ কি?

উত্তর : Psyche শব্দের অর্থ আত্মা বা মন এবং Logos শব্দের অর্থ বিজ্ঞান।

ইংরেজি Psychology শব্দের অর্থ কি?

উত্তর : আত্মা বা মন ।

Persona শব্দটির অর্থ কি?

উত্তর : মুখোশ ।

শাব্দিক অর্থে মনোবিজ্ঞান কি?

উত্তর : মনোবিজ্ঞান হল আত্মা বা মন সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।

এক কথায় মনোবিজ্ঞান কি?

উত্তর : মনোবিজ্ঞান হল আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মনোবিজ্ঞান কি?

উত্তর : আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জীবের আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনাই হল মনোবিজ্ঞান।

মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু কি কি?

উত্তর : চিন্তন, অনুভূতি, ইচ্ছা, দেহ ও মনসম্পর্ক, ব্যক্তিত্ব, চাহিদা, তাড়না, প্রেষণা, আবেগ, স্বায়ুতন্ত্র, শিক্ষণ, স্মৃতি ও বিস্মৃতি, শিক্ষণ, প্রত্যক্ষণ ইত্যাদি ।

মনোবিজ্ঞানের কয়েকটি শাখার নাম লিখ।

উত্তর : শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিল্প মনোবিজ্ঞান, শিশু মনোবিজ্ঞান, সমাজমনোবিজ্ঞান, পরিক্ষণ মনোবিজ্ঞান, অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান।

সমাজ মনোবিজ্ঞান কি?

উত্তর : যে মনোবিজ্ঞান ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক যুক্ত বিষয় সমূহ যেমন সামাজিকীকরণ মনোভাব দল, নেতৃত্ব, গুজব, প্রচারণা, জনমত ইত্যাদি সম্পর্কে এবং সমাজের বিভিন্ন নিয়মনীতি ও আচার আচরনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করে।

শিক্ষা মনোবিজ্ঞান কি?

উত্তর : যে মনোবিজ্ঞান ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষণ ও শিক্ষকের শিক্ষাদান ক্ষেত্রকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষণকে ফলপ্রসু করার চেষ্টা করে তাকে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বলে।

মনোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য কি?

উত্তর : মানসিক অবস্থা ও ক্রিয়ার অনুসন্ধান এবং ব্যাখ্যাই মনোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য।

মানুষের মনের প্রকাশ ঘটে কিভাবে?

উত্তর : তিনটি প্রধান ক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মনের প্রকাশ ঘটে। যথা- ১. চিন্তন, ২. অনুভূতি ৩. ইচ্ছা।

মনের কয়টি স্তর ও কি কি?

উত্তর: মনের তিনটি স্তর। যথা- ক. চেতনা খ. অবচেতন গ. নিজ্ঞান।

মনোবিজ্ঞান পাঠের একটি প্রয়োজনীয়তা লিখ।

উত্তর : মনোবিজ্ঞান পাঠ করলে ব্যক্তি তার আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে সমাজের আদর্শ নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারে।

এরিস্টটল কোন গ্রন্থে মন বা আত্মা সম্পর্কিত ধারণাসমূহকে সুসংবদ্ধ করেন?

উত্তর : De Anima নামক গ্রন্থে।

মনোবিজ্ঞান কোন ধরনের বিজ্ঞান?

উত্তর : মনোবিজ্ঞান প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান।

আধুনিককালে মনোবিজ্ঞানকে কোন অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে?

উত্তর : আচরণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান হিসেবে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা মনোবিজ্ঞানকে কোন ধরনের বিজ্ঞান বলেন?

উত্তর : প্রাণীর আচরণ ও মানসিক ক্রিয়া সম্পর্কিত বিজ্ঞান।

মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের কোন শাখায় অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়?

উত্তর : জীববিজ্ঞানের।

ওয়াটসন কোন ধরণের দার্শনিক?

উত্তর : ওয়াটসন আচরণবাদী দার্শনিক।

মনোবিজ্ঞানে আচরণ বলতে কি বুঝায়?

উত্তর : আচরণ হলো মানুষ বা প্রাণীর সেসব কার্যকলাপ, যা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, লিপিবদ্ধ করা যায়। অর্থাৎ জীবন্ত প্রাণী যা কিছু করে সেসব ক্রিয়া বা কাজকে আচরণ বলে।

‘Overt’ এবং ‘Covert’ আচরণ কি?

উত্তর : যেসব আচরণ বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাকে বাহ্যিক বা ‘Overt’ আচরণ এবং যেসব আচরণ বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না তাকে অভ্যন্তরীণ আচরণ বা ‘Covert’ বলে।

হাঁটা, কথা বলা, বক্তৃতা দেওয়া প্রভৃতি কোন ধরনের আচরণ?

উত্তর : ঐচ্ছিক আচরণ।

ঐচ্ছিক আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য কি?

উত্তর : ঐচ্ছিক আচরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উদ্দেশ্যমুখিতা, নির্বাচনমুখিতা এবং নিয়ন্ত্রণ ।

মানসিক প্রক্রিয়া বলতে কোন বিষয়গুলোকে নির্দেশ করা হয়?

উত্তর : চেতনা, চিন্তন, আবেগ, প্রত্যক্ষণ, স্বপ্ন, বিশ্বাস ইত্যাদি প্রক্রিয়াকে।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীদের তিনটি গোষ্ঠী কি কি?

উত্তর : চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীদের তিনটি গোষ্ঠী হলো- (১) মনোচিকিৎসাবিদ, (২) মনোবিশ্লেষক ও (৩) প্রকৌশল মনোবিজ্ঞানী।

সর্বপ্রথম মনোবিজ্ঞানের গবেষণাগার স্থাপন করেন কে এবং কত সালে?

উত্তর : উইলহেলম উন্ড, ১৮৭৯ সালে।

সামান্যীকরণ কি?

উত্তর : কতিপয় বা বিশেষের ভিত্তিতে সমগ্র শ্রেণি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে সামান্যীকরণ বলে।

Read More-

রচনামূলক প্রশ্ন

 

মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ?

অথবা, মনোবিজ্ঞান কাকে বলে?

উত্তর : 

ভূমিকা : মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মানুষ ক্রমাগত নতুন আবিষ্কার করে চলছে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকে মনে করেন যে, মনোবিজ্ঞান হলো সেই বিজ্ঞান যে বিজ্ঞানের বিজ্ঞানীরা মানুষের হাত দেখে বা চেহারা দেখে তার মনের সব কথা জেনে ফেলবেন। কিন্তু এসব ধারণা সঠিক নয়।

মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানের এক দীর্ঘ অতীত রয়েছে কিন্তু এর ইতিহাস স্বল্পসময়ের। মন ও আচরণের রহস্যময়তা দেখে মানুষ সবসময় বিস্ময়াভূত হয়। সে অর্থে, মানবজাতির বয়সের সমান মনোবিজ্ঞানের বয়স কিন্তু একটি বিজ্ঞানসম্মত শাখা হিসেবে মনোবিজ্ঞানের আবির্ভাব মাত্র একশত বছরের কিছু সময় আগে। 

মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Psychology. Psychology শব্দটি দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ Psyche এবং Logos থেকে এসেছে। Psyche অর্থ আত্মা এবং Logos অর্থ জ্ঞান। অনুধ্যানের একটি বিষয় হিসেবে এ দুটি শব্দ একত্রে ব্যবহার করা হয় ১৬শ শতাব্দীতে। তখন Psyche বলতে আত্মা, অশরীরী শক্তি বা মনকে বোঝাতো, যা শারীর থেকে পৃথক যেমন- গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আত্মা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।” (Psychology is the science of the soul.) পরবর্তীতে আঠারো শতকের প্রথম থেকে এটা মন অনুধ্যানের বিষয় হিসেবে সাহিত্যিক স্বীকৃতি লাভ করে।

মনোবিজ্ঞান হলো মনের বিজ্ঞান- এ ধারণাটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ধীরে, ধীরে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মন সম্পর্কীয় ধারণাও পরিবর্তন হয়ে মনোবিজ্ঞানকে চেতনার বিজ্ঞান বা মানসিক বিজ্ঞান বলা হয়। অর্থাৎ মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও অভিজ্ঞতার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান এবং মানুষের সমস্যার সেই জ্ঞানের প্রয়োগ।

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণের বিজ্ঞান। অর্থাৎ মানুষ যা কিছু করে তার সবকিছু অর্থাৎ আচরণ নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান হলো মনোবিজ্ঞান। বর্তমান সময়ে মানুষের জীবন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আর এ কারণেই মানবীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

মনোবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা দাও।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের সমকালীন/আধুনিক সংজ্ঞা প্রদান কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি বিষয়। কেননা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণকে পরিপূর্ণভাবে বুঝাও অনুধ্যানের জন্য মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। মনোবিজ্ঞান প্রাণীর আচরণের দিকগুলো উন্মোচিত করে। বর্তমান সময়ে মানবীয় জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে মনোবিজ্ঞান বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

মনোবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞান প্রাচীনকালে এক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে অন্য অর্থে। অর্থাৎ মনোবিজ্ঞানের ব্যবহারও পরিবর্তন হচ্ছে। মনোবিজ্ঞান সর্বপ্রথম ব্যবহার হয় প্রাচীন গ্রিক দর্শনে। প্লেটো ও এরিস্টিটলের মাধ্যমে। তারা মনকে আত্মা অর্থে ব্যবহার করেছেন। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মনোবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো :

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন ১৯১৩ সালে মনোবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা দেন। তাঁর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান।”

Clifford T. Morgan and Richard A. King, John R. Weisz and John Schopler-এর মতে, “Psychology is the science of human and animal behaviour it includes the application of this science to human problem.

Henry L. Roediger-এর মতে, “মনোবিজ্ঞানকে আচরণ ও মানস জীবনের সংগঠিত অনুধ্যান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।” (Psychology may be defined as the systematic study of behaviour and mental life.)

John L. Vogel আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন (APA)-এর পৃষ্ঠা ৭-এ বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ অভিজ্ঞতার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান এবং মানুষের সেই জ্ঞানের প্রয়োগ।”

উইলিয়াম বাসকিস্ট-এর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো জীবের আচরণ ও জ্ঞানীর প্রক্রিয়ার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান।”

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান হলো এমন একটি বিজ্ঞান মানুষের প্রয়োজন সাধনে বদ্ধপরিকর। প্রাণীর আচরণ অনুসন্ধানে সক্রিয় এবং মানবীয় জটিল সমস্যার সমাধানে অগ্রসর ভূমিকা পালনকারী বিজ্ঞান।

 

মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : সময় এগিয়ে চলছে অনন্তের পথে। বিজ্ঞান আজ পৃথিবীকে করেছে করায়ত্ত্ব। নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। মনোবিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। প্রাচীনমত প্লেটো এরিস্টটলের আত্মা সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে বসে নেই, মনের অতল গভীরে প্রবেশ করে তাঁরা আজ জীবনের রহস্য উদ্ঘাটনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য : প্রত্যেক বিজ্ঞান, বিষয় বৈশিষ্টমণ্ডিত। তেমনি মনোবিজ্ঞানেরও কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো।

১. আচরণের বিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞান জীব অর্থাৎ প্রাণী ও মানবের আচরণ নিয়ে বিশ্লেষণ করে। ওয়াটস বলেছেন“মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান। “

২. মানবীয় সমস্যা সমাধানের বিজ্ঞান : বর্তমানে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল সমস্যার ভোগেন। এ ধরনের সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত দেবার জন্য মনোবিজ্ঞান কাজ করে।

৩. চেতনার বিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানকে চেতনার বিজ্ঞান বলা হয়। যেমন- Wilhelm Wundt-এর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো মানুষের চেতনা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।”

৪. মনোবিজ্ঞান একটি বিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞান হলো একটি বিজ্ঞান। কেননা মনোবিজ্ঞানেও পরীক্ষাগার ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানের মতো মানুষের আচরণের উপর পর্যবেক্ষণ-নিরীক্ষণ করা হয়। মনের সম্পর্ক আলোচনা করে।

৫. দেহ ও মনের সম্পর্ক : মনোবিজ্ঞানের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি দেহ ও মনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। 

৬. আবেগ : আবেগ মানব জীবনের এমন একটি দিক, যা প্রত্যেকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মনোবিজ্ঞান সেই আবেগ নিয়ে আলোচনা করে। এছাড়াও মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্মৃতি, বিস্মৃতি, প্রেষণা, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি উল্লেখ করা যেতে পারে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে যেমন মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি বৈশিষ্ট্যও। কেননা মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে এখন আর আত্মাকে উল্লেখ করা হয় না আচরণই প্রধান। আচরণ সম্পৰ্কীয় ক্রিয়াকলাপ অনুসন্ধানই মনোবিজ্ঞান।

 

মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় কি কি? যেকোনো একটি বিষয় সম্পর্কে লিখ।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়সমূহ কি? যেকোনো একটি বিষয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। কিন্তু তবুও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জীবনযাত্রার জন্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মনোবিজ্ঞান মানবী সত্তার এসব জটিল সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করে। ব্যক্তি-প্রাণীর আচরণ সম্পৰ্কীয় ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করে সমস্যার সমাধান দেবার চেষ্টা করে।

মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় : মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় বা বিষয়বস্তু মূলত দুটি। যথা- 

১. আচরণ ও 

২. মানসিক প্রক্রিয়া। 

নিম্নে আচরণ সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো :

আচরণ : আচরণ শব্দটির অর্থ মনোবিজ্ঞানে খুবই ব্যাপক। আচরণ বলতে প্রাণীর সেই সকল কার্যাবলিকে বুঝায়, যা গবেষক বা কোনো ব্যক্তি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, লিপিবদ্ধ করতে পারে এবং গবেষণাগারে পরিমাপ করতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীগণ আচরণকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। নিম্নে কিছু দেয়া হল :

বাহ্যিক আচরণ ও অভ্যন্তরীণ আচরণ: মনোবিজ্ঞানীগণ শুধু বাহ্যিক আচরণ নিয়েই আলোচনা করেন না, বরং অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্বন্ধেও আলোচনা করে থাকেন। বাহ্যিক আচরণ হলো- কথা বলা, গান গাওয়া ইত্যাদি। অভ্যন্তরীণ আচরণ হলো- শিক্ষা, স্মৃতি, প্রেষণা, আবেগ, প্রত্যাশা, অনুভূতি চিন্তন।

ঐচ্ছিক আচরণ ও অনৈচ্ছিক আচরণ : যেসব আচরণ ব্যক্তি সচেতনভাবে করে তা ঐচ্ছিক আচরণ। যেমন- কথা বলা, হাঁটা। যেসব আচরণ ব্যক্তির ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে তা অনৈচ্ছিক আচরণ। যেমন- শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া ইত্যাদি। নিম্নে অভ্যন্তরীণ আচরণ উল্লেখ করা হলো :

১. ব্যক্তিত্ব : ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির সকল বৈশিষ্ট্যের সামগ্রিক রূপ। যেমন- ব্যক্তিত্বে প্রকৃতি, এর নির্ধারণ ইত্যাদি।

২. শিক্ষা : অনুশীলনের মাধ্যমে আচরণের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনই শিক্ষা।

৩. স্মৃতি-বিস্মৃতি : অতীত অভিজ্ঞতার যথাযথ পুনরুদ্রেক করতে পারাই স্মৃতি, পক্ষান্তরে ভুলে যাওয়া হলো বিস্মৃতি। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ আচরণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোও মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

উপসংহার : অবশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানের বিচরণ মূলত মানুষকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তির সকল পর্যায় ফুটে উঠে। ব্যক্তির সমগ্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হলো আচরণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়।

 

মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি কি?

অথবা, মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তর:

ভূমিকা: মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞান সময়ের বিবর্তনে উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে বিভিন্ন বিষয় আলোচনার মাধ্যমে। মনোবিজ্ঞানের একটি অন্যতম অবদান হলো দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলোচনা। মনো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি একটি।

মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল বক্তব্য হলো মানব আচরণ অনুধানে অবচেতন শক্তি বা মনোগতির অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ফ্রয়েডীয় ও অন্যান্য মতবাদের সমন্বয়ে গঠিত হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে ফ্রয়েড ও তাঁর অনুসারীদের অর্থাৎ নব্য ফ্রয়েডীয়দের কাজের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ভিয়েনার চিকিৎসক সিগমন্ড ফ্রয়েড মানসিক রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তা মনঃসমীক্ষা (Psychoanalysis) নামে পরিচিত।

ফ্রয়েড মনঃসমীক্ষা শব্দটি তাঁর মনো বৈজ্ঞানিক মতবাদ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে প্রয়োগ করেছেন।

ফ্রয়েডের ধারণা দার্শনিকদের মতাদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মানুষ অযৌক্তিক এবং জৈব চাহিদা দ্বারা তাড়িত হয়ে থাকে। তাঁর মনঃসমীক্ষা তত্ত্বের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো মানুষ কতকগুলো অবচেতন প্রেষ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা যে কোনোভাবে প্রকাশ পায়। সামাজিক প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে আচরণগুলো যথাযথ তা জগতে ছোট শিশুদের মধ্যে অনেক তাড়না সৃষ্টি হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রয়েড লক্ষ্য করেছেন যে, সামাজিকভাবে প্রত্যক্ষকৃত অনেক প্রেষ আছে যা কোন না কোনভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আসে, এমনকি উচ্চ প্রশংসিত আচরণে পরিণত হয়। তিনি যুক্তি দেখান যে, এই ধরনের ইচ্ছার কারণে সভ্যতার সর্বোচ্চ অর্জনে বিশেষত চিত্রকর্ম, সঙ্গীত ও স্থাপত্যকর্মের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অনুপ্রাণীত করে।

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায় যে, ফ্রয়েডের মূল আগ্রহ ছিল মানসিক রোগের বিশ্লেষণ এবং একইসাথে তিনি মানসিক রোগের নিরাময়ের ক্ষেত্রে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতির সফলতা নির্ণয়ে আশাবাদী ছিলেন। যা মনোবিজ্ঞানে মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনাকে প্রসার করে।

 

জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি কি?

অথবা, জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : বহুযুগ পূর্বে মনোবিজ্ঞান দর্শনের কাছ থেকে পৃথক হলেও মনোবিজ্ঞানীদের কাজের মধ্যে আজও বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। মানুষের আচরণের প্রকৃতিও বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ধারা। এর ফলেই মনোবিজ্ঞানে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছে। তেমনি একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি (The Cognitive perspective).

জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি : পরিজ্ঞান সম্পর্কিত অনুধ্যান হলো আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন ধারা। আমাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কিত তথ্যের রূপান্তর বা প্রক্রিয়াকরণকে পরিজ্ঞান (Cognition) বলে। আচরণবাদী যখন মানসিক জীবন এবং চেতনাকে মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞাকে বাদ দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই প্রতিক্রিয়া হিসেবে জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটে। উন্ডের অন্তর্দর্শনবাদ এবং আরো পূর্বে এরিস্টটলের কল্পনা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত প্রাচীন লেখায় এই দৃষ্টিভঙ্গির মূলভিত্তি রচিত হয়েছে। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীরা জানতে চান যে, আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি তা কিভাবে আমরা সংগঠিত স্মরণ এবং বুঝতে পারি। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষকে তথ্যের চরম সক্রিয় প্রক্রিয়াজাতকারক হিসেবে দেখেছেন। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানী আলরিক নিসাস উল্লেখ করেন যে, “Whatever we know about reality has been acted on….by complex systems which interpret and reinterpret sensory information.” এই ব্যাখ্যা ও পূর্ণব্যাখ্যার সাথে মানসিক প্রক্রিয়াসমূহকে সুনির্দিষ্ট করাই হলো জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীগণ মানব মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা সমাধানের সাথে কম্পিউটার ব্যবহারের সাদৃশ্য দেখতে চেষ্টা করেছিলেন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষ কোনো কাজ যেভাবে পূর্বে করে অভ্যস্ত ঠিক সেইভাবে নতুন কাজটি করার চিন্তা করে। মানুষের প্রচলিত চিন্তভাবনাকে পরিবর্তন করে কিভাবে নতুন চিন্তভাবনা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তা জানাই ছিল জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য।

 

মনোবিজ্ঞানের স্বরূপ বা পরিধি ব্যাখ্যা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের পরিধি বা স্বরূপ সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ ক্রমাগত নতুন আবিষ্কার করে চলছে। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বিধায় এটি সম্ভব হচ্ছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের এ যুগে মনোবিজ্ঞানীরাও নিত্যনতুন আবিষ্কার করে চলছেন। আধুনিক যুগে মনোবিজ্ঞানকে বলা হয় আচরণের বিজ্ঞান।

মনোবিজ্ঞানের পরিধি বা স্বরূপ : মনোবিজ্ঞানের পরিধি বর্ণনা করতে গেলে এর মধ্যে কিছু বিষয় লক্ষণীয় হয়ে উঠে। সেগুলো হলো

১. আচরণ,

২. মানসিক প্রক্রিয়া,

৩. মানুষ ও প্রাণী,

৪. বিজ্ঞান ও

৫. জৈব সামাজিক প্রক্রিয়া ।

নিম্নে এগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো :

১. আচরণ : উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া তারা জীবের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। প্রতিক্রিয়ার সামগ্রিক রূপই হলো আচরণ। কোনো বস্তু বা বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটলে স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপিত হয়, ফলে দেহে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই প্রতিক্রিয়াই হলো আচরণ। ক্রাইডার ও তাঁর সঙ্গীদের মতে, “আচরণ হলো যেকোন কার্যকলাপ যা পর্যবেক্ষণ করা যায়, লিপিবদ্ধ করা যায় এবং পরিমাপ করা যায়। জীবন্ত প্রাণীরা যা কিছু করে সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আচরণ বিভিন্ন ধরনের রয়েছে। যেমন- সামগ্রিক ও খণ্ডিত আচরণ ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক আচরণ ইত্যাদি।

২. মানসিক প্রক্রিয়া : মানসিক প্রক্রিয়া বলতে বুঝায় আবেগ, চিন্তন, স্বপ্ন, প্রেষণা, স্মৃতি, প্রত্যাশা, বিশ্বাস ইত্যাদি মানসিক কার্যকলাপ সরাসরি বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না।

৩. মানুষ ও প্রাণী : মনোবিজ্ঞান মূলত মানুষের আচরণ ও মানসিক কার্যকলাপ নিয়ে অনুধ্যান করে। সেজন্য মানুষ ও প্রাণী উভয়ের আচরণই মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়।

৪. বিজ্ঞান: বিজ্ঞান হলো সেই বিশেষ জ্ঞান- যা সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে লাভ করা যায়। মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে।

৫. জৈব সামাজিক প্রক্রিয়া: মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় জীবিত প্রাণীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আবার মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের আচরণ সমাজে প্রভাব ফেলে। আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক ঘটনার গুরুত্ব অপরিসীম।

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায়, মনোবিজ্ঞানের স্বরূপ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আচরণ নিয়েই মনোবিজ্ঞান গঠিত।

 

মনোবিজ্ঞানের বিকাশ লিখ ।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের বিকাশের স্তরগুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের বিকাশের পর্যায়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর ।

উত্তর :

ভূমিকা : বর্তমানে মনোবিজ্ঞান একটি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বেশ পরিচিত লাভ করেছে। এর কারণ মনোবিজ্ঞানীরা প্রায় প্রতিদিনই মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। মনোবিজ্ঞানীগণ মন নিয়ে নয়, মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষের আচরণ সম্বন্ধে অনুধ্যান করেন এবং কাজে পরীক্ষা ও নিরীক্ষা পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।

মনোবিজ্ঞানের বিকাশ : মনোবিজ্ঞানের বিকাশ কয়েকটি স্তরে বিভক্ত করে পর্যালোচনা করতে পারি। যেমনঃ

প্রথম পর্যায় : গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, মনোবিজ্ঞান আত্মা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান।

দ্বিতীয় পর্যায় : জার্মান মনোবিজ্ঞানী ড. উইলহেলস উল্ডের মতে, মনোবিজ্ঞান একটি চেতনার বিজ্ঞান।

তৃতীয় পর্যায় : আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী জে. বি. ওয়াটসন ১৯১৩ সালে “Psychology as the behaviourist views it” নামক প্রবন্ধে যুক্তির সাথে উল্লেখ করেন যে, মনোবিজ্ঞান মানুষ ও প্রাণীর আচরণের বিজ্ঞান।

ই. আর. হিলগার্ড বলেন- মনোবিজ্ঞানকে এমন বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে, যা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে অনুধ্যান করে।

এস. টি. মরগান এবং আর. এ. কিং বলেন- “মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্পর্কীয় বিজ্ঞান।”

চতুর্থ পর্যায় : ক্রাইডার ও তাঁর সহযোগীদের মতে, “আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান হিসেবে মনোবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। আয়ার্সের মতে, “মনোবিজ্ঞান আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান ।”

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান এমন একটি বিজ্ঞান যা মানুষ ও প্রাণীর আচরণ এবং মানসিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে অনুধ্যান করে।

 

মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য লিখ।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্যগুলো সংক্ষেপে আলোচনা কর ।

উত্তর : 

ভূমিকা : একটি সুন্দর জন্ম, জীবন, মৃত্যু সবকিছুর জন্যই মনোবিজ্ঞানের প্রয়োজন। কেননা মনোবিজ্ঞান হলো মানুষের আচরণ সম্পর্কীয় বিজ্ঞান। এটি মানুষের সমস্যায় বিজ্ঞানের প্রয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে। তবু কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ বা উদ্দেশ্য থাকে।

মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য : মনোবিজ্ঞানের লক্ষ অন্য যেকোনো বিজ্ঞানের মতই। বিজ্ঞান টিকে আছে কারণ মানুষ কৌতুহলী, কারণ তারা জ্ঞান পেতে চায়, কারণ তারা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চায়। আর তাই মনোবিজ্ঞানীগণ চারটি লক্ষ স্থিরকরণের মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করতে চান। তা নিম্নে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো :

১. বর্ণনা : মনোবিজ্ঞানের প্রথম ও মৌলিক লক্ষ হলো বর্ণনা করা। অর্থাৎ আচরণ ও মানসিক প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করা।

২. ব্যাখ্যা : মনোবিজ্ঞানের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো উপাত্ত দ্বারা কি বোঝায় তা ব্যাখ্যা করা। মনোবিজ্ঞানীগণ সাধারণত কোনো তত্ত্বের সাহায্যে উপাত্তের ব্যাখ্যা করে থাকেন। তাঁরা তাঁদের তত্ত্বের নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করেন।

৩. ভবিষ্যদ্বাণী : একটি তত্ত্বের নির্ভুলতা ও ব্যবহার যোগ্যতার একটি পরীক্ষা হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে এর ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা। যেমন- জ্ঞানীরা বিকাশের তত্ত্ব। কোনো বিশেষ বয়সে একটি শিশু কেমন আচরণ করবে তা বলে দিতে পারে।

৪. আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার পরিবর্ধন: মনোবিজ্ঞানের শেষ লক্ষ হলো মানবকল্যাণের উন্নয়নের জন্য জ্ঞানের প্রয়োগ। যেমন— চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান। এখানে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার জ্ঞান মানসিক বৈকাল্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।

উপসংহার : সবশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে মানবকেন্দ্রিক। মানুষ জটিলতর সমস্যায় পরিণত হয়। এসব জটিল সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রচেষ্টা চালায় মনোবিজ্ঞান।

 

মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা লিখ ।

অথবা, মনোবিজ্ঞান অধ্যয়নের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা কর ।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞান মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের যেমন তাত্ত্বিক দিক রয়েছে তেমনি ব্যক্তি জীবন থেকে সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন রয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান এক জটিল ও বিস্তৃত ক্ষেত্র। মনোবিজ্ঞানীরা আজকাল নানা সমস্যার সমাধানে নিয়োজিত। অনেকে গবেষণা করছেন কিভাবে সামরিক বাহিনীর ও বিমান বাহিনীর লোকদের সুষ্ঠুভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শেখানো যায় ইত্যাদি কাজে। মনোবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে মহাশূন্যচারীর দৈহিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা জানা যায়। মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।

মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Psychology’ যা দু’টি গ্রিক শব্দ ‘Psyche’ যার অর্থ মন বা আত্মা এবং logos অর্থ বিজ্ঞান থেকে উৎপত্তি হয়েছে। সুতরাং শাব্দিক অর্থে মনোবিজ্ঞানকে মন বা আত্ম সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একে চেতনার বিজ্ঞান ও আচরণের বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীগণ এর সাথে মানসিক প্রক্রিয়াকেও যুক্ত করেছেন।

মর্গান, কিং এবং অন্যান্যরা বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধনীয় বিজ্ঞান এবং এটি মানুষের সমস্যায় এ বিজ্ঞানের প্রয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে।”

মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা: মানব জীবনে মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। দৈনন্দিন জীবনে আমরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হই। এসব সমস্যা সমাধানে মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান অপরিহার্য। নিচে মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো। যথাঃ

১. ব্যক্তিগত জীবনেঃ ব্যক্তিগত জীবনে মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। চলাফেরা ওঠাবসা প্রতিটা ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ও মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগ রয়েছে।

২. সমষ্টিগত জীবনে: সমাজে যৌথভাবে বসবাস করতে গেলে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান দরকার, কিভাবে দলগত সম্পর্ক এবং সদয় সম্পর্ক বৃদ্ধি করা যাবে সে ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে ।

৩. শিক্ষাক্ষেত্রে: ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিকতার বিকাশ ঘটানো, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক উন্নতিকরণ, লেখাপড়ার ব্যাপারে মনোযোগ আগ্রহ বাড়ানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

৪. চিকিৎসাক্ষেত্রে: অস্বাভাবিক ও বিকারগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এবং মানসিক রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এ বিজ্ঞানের জ্ঞানকে কাজে লাগানো হয়।

৫. শিল্পক্ষেত্রে: শিল্প ও কলকারখানায় মনোবিজ্ঞানের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয়। দক্ষ শ্রমিক বাছাইকরণ, শ্রমিক মালিক সম্পর্ক নিরূপণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, শ্রমিক অসন্তোষের কারণ ও তার প্রতিকার নির্ণয়ে মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজন রয়েছে।

৬. শিশুদের ক্ষেত্রে : শিশুদের ক্ষেত্রেও মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিভাবে শিশুদের লালন পালন করতে হবে, কিভাবে শিশুকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যাবে, এসব বিষয় জানতে হলে মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজন রয়েছে।

৭. উপদেশ ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে : আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকি। শিশু ঠিকমত খায় না। ছোট শিশু ঠিকমত স্কুলে যেতে চায় না, চাকরির জন্য একে অন্যে হন্য হয়ে ঘুরে বেড়ায় ইত্যাদি ধরনের সমস্যায় উপদেশ ও নির্দেশনার জন্য মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজন রয়েছে।

৯. ব্যবসার ক্ষেত্রে: কিভাবে উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত করবে, ব্যবসায় কি নীতিগ্রহণ করা যাবে, কিভাবে ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করা যাবে ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে হলে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে।

১০. প্রাণীর আচরণের জৈবিক ক্ষেত্রে: মনোবিজ্ঞান পাঠ করার মাধ্যমে আমরা প্রাণীর আচরণের জৈবিক ভিত্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি।

১১. প্রশাসনের ক্ষেত্রে: সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য সুযোগ্য প্রশাসক দরকার হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানী উপযুক্ত লোক বাছাই করে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারে।

১২. প্রকৌশলের ক্ষেত্রে: বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে অনেক যন্ত্রপাতি তৈরি হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি যাতে সহজে এবং কম লোকের মাধ্যমে কাজ করা যায় সে জন্য মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য।

১৩. অপরাধ দমনে: অপরাধ দমনে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। মানুষ কেন অপরাধ করে বা এর প্রতিকারই বা কি ইত্যাদি বিষয়ে জানার জন্য মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান দরকার।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে আমাদের পরিবার, সমাজের সমস্যা কিভাবে সমাধান করব। ব্যক্তিগত জীবনের যত সমস্যা যেমন- শিশুর সঠিক উপযোজন, দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যার সমাধান জানতে পারি। প্রশাসন কর্মকাণ্ড কিভাবে সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে জানার জন্য মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা মানব জীবনে অপরিসীম।

Leave a Comment