মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ কী কী? পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা কর।

মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ কী কী? পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : কোনো বিষয়বস্তু বৈজ্ঞানিক কিনা তা নির্ভর করে কি পদ্ধতির মাধ্যমে সেই বিষয়ে গবেষণা করা হয় তার উপর । মনোবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিসমূহের সাহায্যে। প্রতিটা বিজ্ঞানই প্রকৃতির একটা নির্দিষ্ট বিভাগ সম্পর্কে আমাদের যথাযথ সুনিশ্চিত, সুসংবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জ্ঞান দান করতে চায়। এ জন্য প্রতিটা বিজ্ঞানেরই উপাত্ত সংগ্রহের দরকার হয়। বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে এরূপ প্রমাণ সাপেক্ষে উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। অন্যান্য বিজ্ঞানের মত মনোবিজ্ঞানেরও বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে প্রমাণযোগ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে এর বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে।

মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞান হলো মন ও আত্মা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ Psychology. যা দুইটি গ্রিক শব্দ Psyche (মন বা আত্মা) এবং logos (বিজ্ঞান) থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান এবং এটি মানুষের সমস্যায় এ জ্ঞানের প্রয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে।

মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ : মনোবিজ্ঞান হচ্ছে আচরণের বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞানের গবেষণাক্ষেত্রে প্রধানত নিম্নলিখিত পদ্ধতিসমূহ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো। যথা:

১. অন্তদর্শন পদ্ধতি;

২. পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি;

৩. পরীক্ষণ পদ্ধতি;

৪. চিকিৎসা পদ্ধতি;

৫. পরিসংখ্যান পদ্ধতি এবং

৬. জরিপ পদ্ধতি।

১. অন্তদর্শন পদ্ধতি : যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে কোনো ব্যক্তি তার নিজের অভিজ্ঞতা পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ বা প্রায়োগিক ভাষার সাহায্যে ব্যক্ত করে থাকে তাকে অন্তদর্শন পদ্ধতি বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে অন্তদর্শন পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যথা:

Knight and Knight বলেন, “ব্যক্তি যখন তার মানসিক প্রক্রিয়া স্বরূপ ও গতি প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করে তখন তাকে অন্তর্দর্শন পদ্ধতি বলে।”

Stout বলেন, “অন্তদর্শন পদ্ধতি হলো নিজের অভিজ্ঞতার প্রতি মনোযোগী হওয়া।”

সুতরাং এ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়াসমূহ সরাসরি জানতে পারে।

অন্তদর্শন পদ্ধতির সুবিধা : অন্তদর্শন পদ্ধতির কিছু সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

(ক) গবেষণায় বিশেষ উপযোগী : অন্তদর্শন পদ্ধতিটি সংবেদন প্রত্যক্ষণ, আবেগ ও চিন্তন সম্পর্কিত গবেষণায় বিশেষ উপযোগী ।

(খ) পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির পরিপূরক : এই পদ্ধতিটি পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণলব্ধ পদ্ধতির পরিপূরক হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।

(গ) পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির তথ্যের ব্যাখ্যা : এই পদ্ধতিটি পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ব্যাখ্যা করা যায়।

(ঘ) মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভ : কোনো নির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ যেকোন নির্দিষ্ট মানসিক ক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ জানার একমাত্র উপায় হলো অন্তদর্শন পদ্ধতি।

(ঙ) মানসিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ : অন্তদর্শন পদ্ধতির সাহায্যে একজন ব্যক্তি তার মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারে অন্য পদ্ধতির মাধ্যমে তা পারে না।

অন্তদর্শন পদ্ধতির অসুবিধা : অন্তদর্শন পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ নিম্নে প্রদান করা হলো। যথা

(ক) সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ : সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে অন্তদর্শন পদ্ধতি প্রয়োগ না করা হলে সাধারণত যথার্থ তথ্য পাওয়া যায় না।

(খ) ক্ষেত্র সীমিত : অন্তদর্শনের ক্ষেত্রে খুবই সীমিত পূর্ণ বয়স্ক ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে অন্তর্দর্শন পদ্ধতি সম্ভব।

(গ) ব্যক্তিকেন্দ্ৰিক : অন্তদর্শন পদ্ধতি অন্তদর্শনের সাহায্যে দু’জন মনোবিজ্ঞানী একই সাথে মানসিক প্রক্রিয়াকে একইভাবে পর্যবেক্ষণ কতে কখনই সক্ষম হয় না।

(ঘ) অবৈজ্ঞানিক : অন্তদর্শন পদ্ধতি ব্যক্তিনিষ্ঠ হওয়াই অন্তদর্শন লাভ তথ্য সঠিক ও সুনিশ্চিত নয়।

(ঙ) অনির্ভরযোগ্য : অন্তদর্শনের পর্যবেক্ষণের নিজস্ব বিষয় হওয়াতে নিজেদের সংবেদন ছাড়া অন্য কোনো সংবেদন আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না এ জন্য এটি অনির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

২. পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিকে বিষয়গত পদ্ধতিও বলা হয়। বহু আগে থেকেই মনোবিজ্ঞানে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবেষণায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোন এক বা একাধিক ঘটনার সামনে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কতগুলো সুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো। যথাঃ

(ক) পরিসংখ্যানের ভাষায় প্রকাশ : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে সংগৃহীত তথ্যগুলোকে সাধারণত পরিসংখ্যানের ভাষায় প্রকাশ করা হয়।

(খ) সকল আচরণ আয়ত্তাধীন : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সব ধরনের আচরণ সম্পর্কে জানা যায়। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সকল আচরণ আয়ত্তাধীন।

(গ) মানসিক অবস্থা জানা যায় : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সাধারণত অন্য ব্যক্তির মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। অন্য ব্যক্তির মনকে জানাতে না পারলে মন সম্পর্কীয় সঠিক নিয়ম আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।

(ঘ) স্বাভাবিক পরিবেশে পর্যবেক্ষণ : যে সকল ঘটনা যেসব পরিবেশ পরিস্থিতিতে ঘটেছে সে সকল তথ্য ভালোভাবে জানা যায় পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে।

(ঙ) পরীক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির বড় সুবিধা হচ্ছে যে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি পরীক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ নিম্নে প্রদান করা হলো। যথা

(ক) ব্যক্তিনিষ্ঠ ফলাফল : এই পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, পূর্বধারণা, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি। পর্যবেক্ষণের ফলাফলের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

(খ) প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা যাচাই : পর্যবেক্ষণের ফলে তথ্য বা প্রাপ্ত ফলাফল পাওয়া যায় তার যথাযথ যাচাই করা অনেক কঠিন। কারণ পর্যবেক্ষণকৃত বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা যায় না ।

(গ) চলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই : পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের যে চলগুলো থাকে সেগুলো সব সময় লাগে না। এক্ষেত্রে সে সব চলকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। 

(ঘ) বহিঃপ্রকাশিত তথ্য থেকে জ্ঞান লাভ করা কঠিন : ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার ফলে যে সকল তথ্য পাওয়া যায়। সে সব তথ্য থেকে ব্যক্তির গভীর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না ।

(ঙ) মানসিক প্রক্রিয়ার ভিন্ন তথ্য : অনেক সময় একই ব্যক্তির মানসিক প্রক্রিয়া বিভিন্ন সময় ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য আসে না।

3.পরীক্ষণ পদ্ধতি : পরীক্ষণ পদ্ধতি একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি। এ পদ্ধতির সাহায্যে মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যে পদ্ধতিতে সুব্যবস্থিত ও সুপরিকল্পিত অবস্থায় সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাপেক্ষ চলের উপর স্বাধীন চলের প্রভাব যাচাই করা হয় তাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি বলে। পরীক্ষণ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কেউ দুটি চলেক মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য একটির মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন এনে দেখেন ফলে অন্যটির মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় কি-না।

পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা : পরীক্ষণ পদ্ধতির কিছু সুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

১. বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ : পরীক্ষণ পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নিয়ম কানুন অনুসরণ করে থাকে। এর ফলে ফলাফল বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে থাকে।

২. চলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন: পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যম চলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করা সম্ভব। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা হয়। বলে পরীক্ষণে কোনো অবাঞ্চিত চল প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। পরীক্ষক চলের ইচ্ছামত পরিবর্তনও করে থাকেন।

৩. পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি : পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কোনো বিষয়ের উপর বার বার পরীক্ষণকার্য পরিচালনা করা যায় । সময় ভেদে পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব হয়ে থাকে। এর ফলেও পরীক্ষণের মূল নকশার পরিবর্তন হয় না।

৪. পরীক্ষণের ফলাফল সঠিক ও সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ : পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে ফলাফল সংক্ষিপ্ত ও সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় । এই পদ্ধতি ফলাফল ব্যক্তিদোষে দুষ্ট হতে পারে না। তাই ফলাফল অধিক নির্ভরযোগ্য হয়।

৫. সাধারণীকরণ : পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে ফলাফল সাধারণীকরণ করা যায়। অল্পসংখ্যক দৃষ্টান্ত সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া যায় ।

পরীক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : নিম্নে পরীক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ আলোচনা করা হলো। যথা

১. পরীক্ষণপাত্রের সাহায্যহীনতা : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি অসুবিধা হচ্ছে যে- পরীক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষণপাত্র অনেক সময় পরীক্ষককে গবেষণা ক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগিতা নাও করতে পারে ।

২. বাহ্যিক গবেষণার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সকল ঘটনা পরীক্ষণকেন্দ্রে করা হয়। এক্ষেত্রে গবেষণাগারে যে সব ঘটনা সৃষ্টি করা যায় না সে সব ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয়। বা এসব ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতি অচল।

৩. কৃত্রিম পরিবেশ : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি ত্রুটি হলো কৃত্রিম পরিবেশ। কৃত্রিম পরিবেশে এসে জীবের আচরণ স্বাভাবিক নাও হতে পারে।

৪. যন্ত্রপাতির দুষ্প্রাপ্যতা : উপযুক্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় গবেষককে যন্ত্রপাতি ও নকশা বানাতে হয় বা ক্রয় করতে হয় যা অধিক ব্যয়বহুল।

৫. নিয়মকানুনের কঠোরতা: পরীক্ষণ পদ্ধতিতে পরীক্ষককে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এর ফলে গবেষণার কাজে সমস্যা হয়ে থাকে।

৪. চিকিৎসা পদ্ধতি : মানসিক রোগের কারণ উদঘাটন তার প্রকৃতি নির্ণয় করার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ চিকিৎসামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। এই পদ্ধতির সাহায্যে প্রধানত মানুষের উপযোজনমূলক আচরণের সমস্যাবলির উপর.অধ্যয়ন করা হয়। চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে ব্যক্তির মানসিক ব্যাধির স্বভাব ও কারণ জানা এবং তার প্রতিকারের ব্যবস্থা.সম্ভব হয়। চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ খুব ব্যাপক। চিকিৎসামূলক পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের আচরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা । আচরণ বৈকল্যের চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসামূলক পদ্ধতি একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি।

চিকিৎসামূলক পদ্ধতির সুবিধা : চিকিৎসামূলক পদ্ধতির কিছু সুবিধা রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করা হলো :

১. রোগীর সমস্যা ও আচরণ সম্পর্কে ধারণা: এই পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীর সমস্যা ও আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কারণ এ পদ্ধতির সাহায্যে মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন প্রকার অভীক্ষা গ্রহণের পর রোগীর প্রকৃত সমস্যা ও আচরণ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে থাকেন। যার ফলে রোগীর চিকিৎসা করতে সহজ ও সুবিধা হয়।

২. মানসিক দক্ষতা উন্নয়ন : চিকিৎসামূলক পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে মানসিক রোগীর মানসিক দক্ষতার উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব।

৩. রোগীর নিজের ও পৃথিবী সম্পর্কে ত্রুটিপূর্ণ ধারণা পরিবর্তন: মানসিক রোগীরা নিজের ও পৃথিবী সম্পর্কে যারা ধারণা পোষণ করে থাকে । চিকিৎসামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে এ ধারণা দূর করা যায়।

চিকিৎসা পদ্ধতির অসুবিধা : চিকিৎসা পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

১. বিজ্ঞানসম্মত নয় : চিকিৎসামূলক পদ্ধতি সাধারণ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত হয় না।

২. সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি : চিকিৎসামূলক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করার কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই।

৩. দীর্ঘ সময় : চিকিৎসামূলক পদ্ধতিতে ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।

৪. যথার্থতা যাচাই : চিকিৎসামূলক পদ্ধতিতে রোগীর প্রদত্ত তথ্য যথার্থভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। 

৫. পরীক্ষণমূলক প্রকল্প : চিকিৎসামূলক পদ্ধতিতে কোনো পরীক্ষণমূলক প্রকল্প গঠন করা যায় না।

৫. পরিসংখ্যানমূলক পদ্ধতি : পরিসংখ্যান পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়- আধুনিককালে মনোবিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে, সাধারণত পরিসংখ্যান পদ্ধতির ব্যবহার অন্যান্য পদ্ধতি হতে অনেকটা পৃথক, পরিসংখ্যান পদ্ধতি অন্যান্য পদ্ধতিতে প্রাপ্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ করাই হলো এ পদ্ধতির কাজ। পরিসংখ্যান পদ্ধতির মূল কাজ হলো তথ্য প্রক্রিয়াজাত এবং তথ্যকে বিশ্লেষণ করা। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের জন্য গড়, মধ্যমা, প্রচুরক, আদর্শ বিচ্যুতি, গড় বিচ্যুতি, শতধিক বিন্দু প্রভৃতি পরিসংখ্যানিক পরিমাপ ব্যবহার করা হয়।

পরিসংখ্যান পদ্ধতির সুবিধা : পরিসংখ্যান পদ্ধতির কিছু সুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. তথ্যকে সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ : পরিসংখ্যান পদ্ধতির সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্যকে সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় ।

২. বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ : পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।

৩. সংক্ষিপ্ত ও অর্থপূর্ণভাবে প্রকাশ : পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণে তথ্যকে সংক্ষেপে এবং অর্থপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায়।

৪. অনুমান যাচাই : নমুনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সমগ্রক সম্পর্কিত অনুমান সঠিক কি-না তা যাচাই করা যায় ।

৫. নকশা প্রণয়নে সাহায্য করে : পরিসংখ্যান পদ্ধতি উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ধরনের নকশা প্রণয়নে সাহায্য করে থাকে।

পরিসংখ্যান পদ্ধতির অসুবিধা : পরিসংখ্যান পদ্ধতির কিছু সংখ্যক অসুবিধা রয়েছে, সেগুলো নিচে দেয়া হলো :

১. সামগ্রিক তথ্য উদঘাটন : পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে তথ্য সম্পর্কিত সামগ্রিক রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়।

২. অনুপযোগী পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে প্রাপ্ত তথ্য সুষম না হলে পরিসংখ্যান পদ্ধতি অনুপযোগী।

৩. গুণবাচক তথ্য ব্যাখ্যা করা কঠিন : পরিসংখ্যান পদ্ধতির সাহায্যে গুণবাচক তথ্য ব্যাখ্যা করা সহজ নয়।

৬. জরিপ পদ্ধতি : মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে হলে জরিপ কাজ করতে হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন ইস্যু সম্পর্কে জনমত যাচাই কাজে জরিপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। জরিপ পদ্ধতিতে সাধারণত লিখিত প্রশ্ন বা মৌখিক প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ।

জরিপ পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো নমুনা চয়ন। সমস্ত জনসংখ্যা সবার উপর জরিপ চালানো সম্ভব নয়। তাই সমগ্রক থেকে প্রতিনিধিত্ব নমুনা জনগোষ্ঠীকে নির্বাচন করা হয়। নমুনা জনগোষ্ঠীকে সাধারণত দৈব ক্রমানুসারে বাছাই করা হয়ে থাকে। জরিপ পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। নির্বাচনের সময় জনমত যাচাই করার জন্য জরিপ পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যে-কোনো জরিপে নমুনা নির্বাচন যথাযথ না হলে সেই জরিপের উপর ভিত্তি করে মন্তব্য করা ঠিক না। অন্যদিকে শুধু জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমেই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিষয়ে স্বল্প সময়ে মন্তব্য করা সম্ভব হয়।

জরিপ পদ্ধতির সুবিধা : জরিপ পদ্ধতির কিছু সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো যথা

১. কম খরচ : জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায় ।

২. নমনীয়তা : জরিপ পদ্ধতি তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহারে অধিক নমনীয়। কেননা এতে পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা যে-কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।

৩. উদঘাটনমূলক : জরিপ পদ্ধতি গবেষককে অপ্রত্যাশিত ও অজানা সম্ভাব্য সমস্যা উদঘাটন করা সম্ভব হয়।

৪. তত্ত্ব যাচাই : জরিপ পদ্ধতি গবেষককে তত্ত্ব যাচাই করতে সহায়তা করে। কেননা তত্ত্ব তথ্যের উপর নির্ভরশীল।

জরিপ পদ্ধতির অসুবিধা : জরিপ পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

১. সময় সাপেক্ষ : জরিপ পদ্ধতির একটি প্রধান সমস্যা বা অসুবিধা হচ্ছে সময় সাপেক্ষ। অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহ করা একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

২. গবেষকের প্রভাব : জরিপ পদ্ধতিতে গবেষকের ইচ্ছা ও অনিচ্ছামূলক ও মূল্যবোধের প্রভাব গবেষণার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

৩. নমুনাজনিত সমস্যা : জরিপের অনেকগুলো বিষয়ই খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। এসব বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করলে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে তা অকেজো হয়ে যায় ।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো অন্যান্য সাধারণ পদ্ধতিগুলোর থেকে অন্যতম। কারণ মনোবিজ্ঞানে ব্যাবহৃত পদ্ধতিগুলো অনেক বেশি ফলপ্রসূ। জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে সমগ্রক সম্পর্কে জানা যায় এবং এটি সারা বিশ্বে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। পরিসংখ্যান এবং চিকিৎসামূলক পদ্ধতিটিও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যানের সাহায্যে বিভিন্ন তথ্যকে সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়। পরীক্ষণ পদ্ধতিকে বিজ্ঞানমূলক পদ্ধতিও বলা হয় কারণ এটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত তথ্য প্রাকৃতিক সম্পন্ন তথ্য হয়ে থাকে। সুতরাং মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতি অন্যতম।

Leave a Comment