মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের প্রধান বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ কর?

মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান কাকে বলে? মনোবিজ্ঞানের সার সংক্ষেপে আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা: মনোবিজ্ঞান আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান। আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করাই হলো মনোবিজ্ঞানের প্রধান কাজ। কারণ সমাজ জীবন টিকে আছে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে। তাই সুষ্ঠু সমাজ জীবনে বসবাসের জন্য মানুষের আচরণ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন খুবই জরুরী। মনোবিজ্ঞানকে অনেকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি শাখা বিজ্ঞান হিসেবে মনে করে। আবার অনেকে একে সামাজিক বিজ্ঞানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রমাণ করতে চান।

মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা : দু’টি গ্রিক শব্দ ‘Psyche’ এবং ‘Logos’ থেকে ‘Psychology’ শব্দটি এসেছে ‘Psyche’ শব্দের অর্থ আত্মর এবং ‘Logos’ অর্থ বিদ্যা বা জ্ঞান। এ দু’টি অবিধা থেকে বলা যায় মনোবিজ্ঞান হলো আত্ম সম্পর্কিত জ্ঞান বা বিজ্ঞান।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে বিভিন্ন সমাজ ও মনোবিজ্ঞানী মন্তব্য করেন এভাবেমর্গান, কিং, ওয়াইজ, এবং স্কেপলার বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান এবং এটি মানুষের সমস্যায় এ বিজ্ঞানের প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত করে। 

ক্রাইভার, গোথালয়; কেভানহ ও সলোমন বলেন, “মনোবিজ্ঞানকে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান সম্মত অনুধ্যান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।” 

রডিজার, রাষ্টন, কেপালডি এবং প্যারিস বলেন, “মনোবিজ্ঞানকে আচরণ ও মানব জীবনের সুসংগঠিত অনুধ্যান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।” 

জন.এল. ভোগেল বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও অভিজ্ঞতার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান এবং মানুষের সমস্যায় সেই জ্ঞানের প্রয়োগ।”

ওয়াইনি ওয়াইটেন বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো সেই বিজ্ঞান যা আচরণ এবং এর অন্তরালে নিহিত শরীরবৃত্তীয় ও জ্ঞানগত প্রতিক্রিয়াসমূহ অনুধ্যান করে এবং এটি হলো সেই পেশা যা বাস্তব সমস্যায় এ বিজ্ঞান তার সঞ্চিত জ্ঞানকে প্রয়োগ করে।

Also Read –

মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু : উল্লেখিত সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মনোবিজ্ঞান মানুষ ও প্রাণীর আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অনুধ্যান করে। আর এর মাধ্যমে প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে-

১. আচরণ : সাধারণ অর্থে আচরণ হলো প্রাণী বা মানুষ সেসব কার্যকলাপ, যা বহুলাংশে পর্যবেক্ষণ করা যায়। বাহিক বস্তুর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটলে স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপত হয় এবং প্রাণী তার প্রতি বাহ্যিক ক্রিয়ার মাধ্যমে সাড়া দেয়। আর এই সাড়া দেওয়াকে প্রতিক্রিয়া বলে। এই প্রতিক্রিয়াই হলো আচরণ। উদ্দীপকের প্রতিক্রিয়া করা জীবের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। প্রতিক্রিয়ার সামগ্রিক রূপই হলো আচরণ। এক কথায় প্রাণী যা কিছু করে তাই আচরণ। আচরণ বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং গবেষণাগারে তা পরিমাপ করা যায়। আচরণকে আবার কয়েকভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

(ক) সামগ্রিক আচরণ ও খণ্ডিত আচরণ : আচরণকে আমরা সামগ্রিকভাবে দেখে থাকি। আবার খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্নভাবেও দেখে থাকি । সামগ্রিক আচরণকে একটি পূর্ণাঙ্গ আচরণের বিশ্লেষণের একক হিসেবে ধরা হয়। আর খণ্ডিত আচরণ বা আনবিক আচরণের ক্ষেত্রে আচরণকে খণ্ড খণ্ড বা সূক্ষ্ম উপাদানে বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো রাজনীতিবিদের জনসভার ভাষণকে সামগ্রিক আচরণ এবং তার বেশি সঞ্চালন, ঠোট নাড়া, চোখের পলক পড়া প্রভৃতিকে খণ্ডিত আচরণ বা আণবিক আচরণ বলা যেতে পারে।

(খ) ঐচ্ছিক আচরণ ও অনৈচ্ছিক আচরণ : যেসব আচরণ ব্যক্তি সচেতনভাবে করে অর্থাৎ যে সকল আচরণ ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে সেগুলোকে ঐচ্ছিক আচরণ বলে। যেমন কথা বলা, হাঁটা, খাবার খাওয়া ইত্যাদি। আবার.কতগুলো আচরণ আছে যেগুলো ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই করতে পারে না। তার ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে সেসব আচরণকে অনৈচ্ছিক আচরণ বলে। যেমন হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া, স্বাস-প্রশ্বাস, আগুনে হাত লাগা মাত্রই হাত সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি।

(গ) বাহ্যিক আচরণ ও অভ্যন্তরীণ আচরণ: বাইরে থেকে যেসকল আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায় যেমন কথা বলা, চলা, হাসা, গান গাওয়া প্রভৃতি বাহ্যিক আচরণ। আবার যে সকল আচরণ বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না সেগুলোকে অভ্যন্তরীণ আচরণ বলে। যেমন- শারীরিক ব্যথা, মাথাধরা, চিন্তা করা, কবিতার ভাবনা প্রভৃতি। এছাড়া আবেগ, প্রেষণা, স্মৃতি, প্রত্যক্ষণ, অনুভূতি প্রভৃতি হলো অভ্যন্তরীণ আচরণ। যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় না।

২. মানসিক প্রক্রিয়া : মানসিক প্রক্রিয়া বলতে আবেগ, অনুভূতি, চিন্তন, স্বপ্ন, স্মৃতি, প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, বিশ্বাস ইত্যাদি। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এ সব প্রক্রিয়া অনুধ্যান করার জন্য বর্তমানকালে মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তাই মানসিক প্রক্রিয়া মনোবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

৩. মানুষ ও প্রাণী : মনোবিজ্ঞান মূলত মানুষের আচরণ ও মানসিক কার্যকলাপ নিয়ে অনুধ্যান করে। যে সকল ক্ষেত্রে মানুষের উপর পরীক্ষণ করা সম্ভব নয় এবং সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে সেসব ক্ষেত্রে নিম্নতর প্রাণীর উপর পরীক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সে জন্য মানুষ ও প্রাণী উভয়ই মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

৪. বিজ্ঞান: বিজ্ঞান হলো সেই বিশেষ জ্ঞান, যা সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে লাভ করা যায়। বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। এজন্য মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা হয়েছে।

৫. ব্যক্তিত্ব : মনোবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলো মানুষের ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তির যাবতীয় আচরণের সামগ্রিক রূপই হলো ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্বের স্বরূপ, এর উপাদান, শ্রেণিবিভাগ, বিকাশ, ব্যক্তিত্বের পরিমাপ প্রভৃতি মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বলে গণ্য ।

৬. বুদ্ধি : ব্যক্তির আচরণ মানসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। বুদ্ধির পরিচায়ক আচরণসমূহ, বুদ্ধি কিভাবে আচরণকে প্রভাবিত করে, কিভাবে বুদ্ধি পরিমাপ করা যায়, বুদ্ধির অভীক্ষা ও তার উন্নতি প্রভৃতি মনোবিজ্ঞানের আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু।

৭. প্রত্যক্ষণ : সংবেদন কি করে আমাদের আচরণে সাড়া জাগায় চেতনা তৈরি করে, কিভাবে প্রত্যক্ষণ সংগঠিত হয়, প্রত্যক্ষণ সংগঠনের নীতিমালাই বা কি, ভ্রান্ত, অলিক প্রত্যক্ষণ প্রভৃতি মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ মানসিক প্রক্রিয়ার অনুধ্যান। তাই মানুষ ও প্রাণীর আচরণ জানতে মনোবিজ্ঞানের পরিধি ও বিষয়বস্তু ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনোবিজ্ঞান বর্তমান বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে তার আলোচনা করছে। এ কথায় এ জগতে যা কিছু মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে সম্বন্ধযুক্ত তার সবই মনোবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়বস্তু।

Leave a Comment