মনোবিজ্ঞানের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ কি কি?

অথবা, মনোবিজ্ঞানে যেসব দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায় তা লিখ।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের প্রধান প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ লিখ।

 

উত্তরঃ

ভূমিকা : 

যদি কয়েকজন পদার্থবিদকে জিজ্ঞাসা করা হয়, বস্তু কেন নিচের দিকে পড়ে। কয়েকজন আবহাওয়াবিদকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আবহাওয়া কেন পরিবর্তিত হয়, অথবা কয়েকজন রসায়নবিদকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় প্লাস্টিক কিভাবে তৈরি হয়, তাহলে বিস্তারিত বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রগুলোর যে কোন একটি বিশেষজ্ঞগণের উত্তর হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ : 

মনোবিজ্ঞানে যেসব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. জৈব মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : জৈব মনোবিজ্ঞান শারীরবিদ্যাকে, বিশেষত মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপকে মনোবিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত করে। জৈব মনোবিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত বক্তব্য হল প্রত্যেক আচরণ, অনুভূতি ও চিন্তনের বিপরীতে মস্তিষ্কে একটি শারীরিক ঘটনা বর্তমান। এ দু’ধরনের ঘটনার সম্পর্ক অনুভব বা ব্যাখ্যাই হল জৈব মনোবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। শিক্ষণের সময় মস্তিষ্কে কি ধরনের পরিবর্তন ঘটে? মানসিক অসুস্থতার সময় মস্তিষ্কে রাসায়নিক কি পরিবর্তন হয়? আক্রমণাত্মক কাজ করার সময় মস্তিষ্কে কি ঘটে? এগুলোই হল জৈব মনোবিজ্ঞানীর জিজ্ঞাসা। তারা জানতে চান, মস্তিষ্কের কোন কোন অংশ কোন কোন বিশেষ আচরণের জন্য দায়ী।

২. মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল, মানব আচরণ আনুধাবন করার ক্ষেত্রে অবচেতন শক্তির বা মনোগতির (Unconscious forces বা Psychodynamics) ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রয়েডীয় এবং অন্যান্য মতবাদের সমন্বয়ে মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে গড়ে উঠেছে ফ্রয়েড ও তাঁর অনুসারী, নব্য ফ্রয়েডীয়দের কাজের মাধ্যমে। ফ্রয়েড এর কাজ মনঃসমীক্ষণ মতবাদ বা Psychoanalytic theory নামে পরিচিত।

৩. জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি : জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন ধারা। জ্ঞান বা Cognition হল একটি ব্যাপক শব্দ যার অর্থ হল আমাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কিত তথ্যের রূপান্তর বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া। আচরণবাদী কর্তৃক মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা থেকে মানসিক জীবন ও চেতনাকে বাদ দেওয়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া হিসেবে জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। এ দৃষ্টিভঙ্গির মূল নিহিত রয়েছে অন্তদর্শনবাদে এবং আরও পূর্বে, এরিস্টটলের কল্পনা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত প্রাচীন লেখায়। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীরা জানতে চান, আমরা যাকিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি তা কিভাবে আমরা সংগঠিত করি, মনে রাখি এবং বুঝতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, পৃষ্ঠার উপর ছোট ছোট কালির রেখা দিয়ে কিভাবে অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করা যায়? বন্ধু কর্তৃক সৃষ্ট শব্দ তরঙ্গকে ভাষান্তরিত করে কিভাবে কথোপকথনের বাক্যগুলো সনাক্ত করা সম্ভব হয়?

৪. আচরণগত বা ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি : আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটেছে অনেকটা উন্ড এর অন্তদর্শন পদ্ধতির প্রতি প্রতিক্রিয়া করতে যেয়ে। আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানীগণ অনুভব করলেন যে, অন্তদর্শনের মাধ্যমে চেতনাকে অনুধ্যান করা খুবই অবৈজ্ঞানিক। তাদের মূলকথা হল মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হতে হলে এটিকে অবশ্যই পর্যবেক্ষণযোগ্য অনুধ্যান করতে হবে, যেমন আচরণ। এ দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীদের মতে, মনোবিজ্ঞান হল আচরণের বিজ্ঞান। আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানীরা আচরণকে প্রতিক্রিয়া এবং যেভাবে পরিবেশের উদ্দীপক দ্বারা প্রতিক্রিয়া প্রভাবিত হয় তা অনুধ্যান করেন।

৫. মানবিক বা মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি : অন্তদর্শনবাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া করতে গিয়ে যেমন আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি মনঃসমীক্ষণ ও আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির ত্রুটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া করতে গিয়ে পরবর্তী কয়েক দশকে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশ লাভ করে। এ দু’টি দৃষ্টিভঙ্গির রয়েছে তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং চিত্তাকর্ষক ব্যাখ্যা ক্ষমতা। কিন্তু এতে ব্যক্তির কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া অথবা সুপ্ত তাড়নার জন্য ব্যক্তিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিন্তু সমগ্র ব্যক্তিটিকে তার সকল অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, চাহিদা, সমস্যা এসব বিষয় বিবেচনায় আনা হয় নি। এর প্রেক্ষাপটে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সমগ্র ব্যক্তির উপর জোর দিয়ে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ জন্মলাভ করে, যার নাম মানবিক মনোবিজ্ঞান।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কখনও কখনও একটি দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা অন্যটি তৈরিতে সাহায্য করে। এককভাবে কোন দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান বা সঠিক নয়। কোন সময় কোন কোন দৃষ্টিভঙ্গি অন্যগুলোর চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তাদের সবগুলোরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য থাকে। তবে এভাবে চিন্তা করা ঠিক যে, আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার মত জটিল বিষয় অনুধ্যানে প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

Leave a Comment