মনোবিজ্ঞান অনার্স ১ম বর্ষের ভূমিকা অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ রচনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর

মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি বর্ণনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ? মনোবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি পর্যালোচনা কর ।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই তথ্য প্রযুক্তির যুগে মানুষ ক্রমাগত নতুন আবিষ্কার করে চলছে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকে মনে করেন যে, মনোবিজ্ঞান হলো সেই বিজ্ঞান যে বিজ্ঞানের বিজ্ঞানীরা মানুষের হাত দেখে বা চেহারা দেখে তার মনের সব কথা জেনে ফেলবেন, কিন্তু এসব ধারণা সঠিক নয়। বর্তমানে মনোবিজ্ঞান হলো চেতনার বিজ্ঞান ।

মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Psychology. Psychology শব্দটি দুটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ Psyche এবং logos থেকে এসেছে। Psyche অর্থ আত্মা এবং Logos অর্থ জ্ঞান। অনুধ্যানের একটি বিষয় হিসেবে এ দুটি শব্দ একত্রে ব্যবহার করা হয় ১৬শ শতাব্দীতে। তখন Psyche বলতে আত্মা, অশরীরী শক্তি বা মনকে বোঝাতো, যা শরীর থেকে পৃথক। যেমন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আত্মা সম্পৰ্কীয় বিজ্ঞান ।”

আধুনিক সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞান প্রাচীনকালে এক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে অন্য অর্থে। অর্থাৎ মনোবিজ্ঞানের ব্যবহারও পরিবর্তন হচ্ছে। মনোবিজ্ঞান সর্বপ্রথম ব্যবহার হয় প্রাচীন গ্রিক দর্শনে। প্লেটো ও এরিস্টিটলের মাধ্যমে। তারা মনকে আত্মা অর্থে ব্যবহার করেছেন। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মনোবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো :

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন ১৯১৩ সালে মনোবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা দেন। তাঁর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান।”

মনোবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি : মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা বিশ্লেষণের পর এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় ফুটে উঠে।

যথা- 

১. আচরণ, 

২. মানসিক প্রক্রিয়া, 

৩. মানুষ ও প্রাণী, 

৪. বিজ্ঞান (Science) এবং 

৫. জৈব সামাজিক প্রক্রিয়া ।

নিম্নে এগুলো বিশ্লেষণ করা হলো :

১. আচরণ : সহজভাবে বলা যায়, জীবিত প্রাণী যা কিছু করে সেসব কাজই হলো আচরণ। অন্যভাবে বলা যায়, উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া করা জীবের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। প্রতিক্রিয়ার সামগ্রিক রূপই আচরণ। কোনো বস্তু বা বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটলে স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপিত হয়। ফলে দেহে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই প্রতিক্রিয়াই হলো আচরণ। এক কথায়, প্রাণী যা কিছু করে তাই হলো আচরণ, আচরণ বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং গবেষণাগারে তা পরিমাপ করা যায়।

ক্রাইডার ও তাঁর সঙ্গীদের মতে (১৯৯৩), “আচরণ হলো যে কোন কার্যকলাপ যা পর্যবেক্ষণ করা যায়। লিপিবদ্ধ করা যায় এবং পরিমাপ করা যায়। জীবন্ত প্রাণীরা যা কিছু করে সবই এর অন্তর্ভুক্ত।” কোন ব্যক্তি পত্রিকায় চল্লিশ লক্ষ টাকার ফলাফলে দেখতে পেল যে, সে-ই প্রথম পুরস্কারটি পেয়েছে। সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল এবং চিৎকার করে সবাইকে তা জানালো। এতে করে বাহির থেকে তার মুখে আবার কথাবার্তা দেখে পরিলক্ষিত হয় যে, সে আনন্দিত হয়েছে এবং শরীরাভ্যন্তরে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটেছে। কোনো, কি প্রক্রিয়ায় আচরণ ঘটে তা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করাই মনোবিজ্ঞানের কাজ। এই আচরণ সামগ্রিক, খণ্ডিত, ঐচ্ছিক অনৈচ্ছিক, বাহ্যিক অভ্যন্তরীণ হতে পারে।

২. মানসিক প্রক্রিয়া : মানসিক প্রক্রিয়া বলতে বুঝায় আবেগ, চিন্তন, স্বপ্ন, স্মৃতি, প্রেষণা, প্রত্যাশা ইত্যাদি। মানসিক কার্যকলাপ সরাসরি বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। যেমন- চল্লিশ লক্ষ টাকা পাবার আনন্দ উপলব্ধির পর সে চিন্তা করে কিভাবে টাকাটা ব্যয় করবে। মেডিকেল করে গ্রামের হতদরিদ্র লোকদের সহায়তা করে ইত্যাদি। এ ধরনের চিন্তার সাথে সাথে সে কল্পনার জগতে চলে গেল। এই কল্পনার জগতে বিচরণটাই হলো মানসিক কার্যকলাপ। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এসব প্রক্রিয়া অনুধ্যান করার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ বর্তমানকালে বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তাই মানসিক প্রক্রিয়া মনোবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

৩. মানুষ ও প্রাণী : মনোবিজ্ঞান মূলত মানুষের আচরণ ও মানসিক কার্যকলাপ নিয়ে অনুধ্যান করে। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের উপর পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না সেসব ক্ষেত্রে নিম্নতর প্রাণীর উপর পরীক্ষা পরিচালনা করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মনোবিজ্ঞানে বেশিরভাগ অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা করা হয় মানুষের উপর। তবে অনেকেই নিম্নতর প্রাণী নিয়ে গবেষণা করেছেন। যেমন- ই. এল. ডাইক ইঁদুর, বি. এফ. স্কীনার ইঁদুর ও কবুতর, আইভান প্যাভলভ কুকুর এবং কৌলার শিম্পাঞ্জি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

৪. বিজ্ঞান : বিজ্ঞান হলো সেই বিশেষ জ্ঞান যা সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে লাভ করা যায়। বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। মনোবিজ্ঞান বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে। আচরণের অনুধ্যান যেন বিজ্ঞানসম্মত হয় তা নিশ্চিত রাখার জন্য মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানের নীতিমালা মেনে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া অনুধ্যান করে। এজন্য মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা হয় ।

৫. জৈব-সামাজিক প্রক্রিয়া: মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় জীবিত প্রাণীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক ঘটনার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন- অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা গ্রন্থির প্রভাবে মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে। আর মানুষ সামাজিক জীব বলে সমাজের মানুষের আচরণ দ্বারা যেমন- মানুষ প্রভাবিত হয় তেমনি উক্ত ব্যক্তির আচরণের প্রভাব সমাজের উপর পরিলক্ষিত হয়। যেমন- কোনো সমাজের চাল-চলন, কৃষ্টি, রীতিনীতি ইত্যাদি মানুষকে প্রভাবিত করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, জৈবিক ঘটনাবলি যেমন মানব আচরণে প্রভাব ফেলছে তেমনি সামাজিক প্রক্রিয়া ও আচরণের উপর প্রভাব ফেলছে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানে আচরণ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁরা আচরণকে বিভিন্নভাবে জানার চেষ্টা করেন। এর ফলে মনোবিজ্ঞানের কর্মপরিধি বা আলোচনার ক্ষেত্র বেড়ে গেছে।

 

মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান কাকে বলে? মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : বর্তমানে মনোবিজ্ঞান একটি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন। এর কারণ মনোবিজ্ঞানীরা প্রায় প্রতিদিনই মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। যদিও পূর্বে ধারণা করা হতো মনোবিজ্ঞান মন নিয়ে আলোচনা করে কিন্তু এ ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়ে মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষের আচরণ সম্বন্ধে অনুধ্যান করেন এবং এ ধরনের অনুধ্যান কাজে পরীক্ষা ও নিরীক্ষা পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।

মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু: মনোবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ এবং মানসিক প্রক্রিয়া । নিম্নে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য বিষয়বস্তু বর্ণনা করা হলো :

১. আচরণ : আচরণ শব্দটির অর্থ মনোবিজ্ঞানে খুবই ব্যাপক। ক্রাইডার এবং অন্যান্যরা বলেন- “আচরণ হলো যে কোনো কার্যকলাপ যাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, লিপিবদ্ধ এবং পরিমাপ করা যায়। জীবন্ত প্রাণীরা বা জীবজন্তুরা একটি পরিসরে যে গতিপ্রকৃতি করে তা সবই আচরণের অন্তর্ভুক্ত।

মনোবিজ্ঞানীগণ আচরণকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন । যথা :

(ক) সামগ্রিক ও খণ্ডিত আচরণ: যখন কোনো ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ আচরণকে বিশ্লেষণের একক হিসেবে ধরা হয় তা সামগ্রিক আচরণ এবং সূক্ষ্ম উপাদানে ব্যাখ্যা করা হয় তা খণ্ডিত আচরণ।

(খ) বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আচরণ : মনোবিজ্ঞানীগণ শুধু বাহ্যিক আচরণ নিয়েই আলোচনা করেন না, বরং অভ্যন্ত রীণ প্রক্রিয়া সম্বন্ধেও আলোচনা করেন।

(গ) ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক আচরণ : প্রাণী যেসব আচরণ সচেতনভাবে করেন তা ঐচ্ছিক আর যেসব আচরণ ইচ্ছানুযায়ী করে না সেসব আচরণকে অনৈচ্ছিক আচরণ বলে।

২. মানসিক প্রক্রিয়া : অতি সাম্প্রতিককালের মনোবিজ্ঞানীগণ মানসিক প্রক্রিয়ার উপর গবেষণা করে অনুভব করেন যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে আচরণের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনুধ্যান করা সম্ভব। যেমনএকজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের পরিমাপ থেকে মনোবিজ্ঞানী ব্যক্তির মানসিক চাপ সম্পর্কে জানতে পারেন। মানসিক প্রক্রিয়া হলো চিন্তন, স্মৃতি, প্রত্যাশা, আবেগ, প্রেষণা ইত্যাদি । এছাড়াও মনোবিজ্ঞানের আরও অনেক বিষয়বস্তু রয়েছে। তা নিয়ে বর্ণনা করা হলো :

১. ব্যক্তিত্ব : ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির সকল বৈশিষ্ট্যের সামগ্রিক রূপ। ব্যক্তিত্বের প্রকৃতি, এর নির্ধারণ শ্রেণীবিভাগ প্রভৃতি মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

২. শিক্ষা : পূর্ব অভিজ্ঞতা বা অনুশীলনের মাধ্যমে আচরণের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনই শিক্ষা। শিক্ষণের ফলে মানুষ সমাজ উপযোগী আচরণ করে এবং অনুপোযোগী আচরণ ত্যাগ করে।

৩. গবেষণা-পদ্ধতি : মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অনুধ্যান করার ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে। যেমন- অন্তদর্শন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, জরিপ পদ্ধতি ইত্যাদি ।

৪. স্নায়ুতন্ত্র : আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জৈবিক ঘটনাসমূহের প্রভাব অপরিসীম। স্নায়ুতন্ত্রের আলোচনার মাধ্যমে আমরা জৈবিক ঘটনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারি।

৫. প্রেষণা : ব্যক্তি বা প্রাণী তার প্রেষণা পূরণের জন্য কর্মে উদ্যোগী হয় এবং নির্বাচিত আচরণ করে। প্রাণী ও মানুষের জীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রেষণার উদ্ভব হয়ে থাকে। ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ চাপ বা তাগিদই প্রেষণা।

৬. স্মৃতি-বিস্মৃতি : অতীত অভিজ্ঞতার যথাযথ পুনরুদ্ধার করতে পারাই স্মৃতি। পক্ষান্তরে, ভুলে যাওয়া হলো বিস্মৃতি । স্মৃতি ও বিস্মৃতির কারণ, স্মৃতি উন্নয়নের কৌশল ইত্যাদি মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় ।

৭. বুদ্ধি : বুদ্ধি ব্যক্তির এক ধরনের ক্ষমতা যার দ্বারা সে বাস্তব লক্ষ সম্পর্কে জানতে পারে এবং সমস্যা সমাধানে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বুদ্ধি কিভাবে আচরণকে প্রভাবিত করে, বুদ্ধি কিভাবে পরিমাপ করা যায় ইত্যাদি মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

৮. প্রত্যাশা : উদ্দীপকের প্রতি প্রাথমিক চেতনাবোধ বা অনুভূতিই হলো সংবেদন সংবেদনকে ব্যাখ্যা করাই প্রত্যাশা।

৯. হতাশা ও দ্বন্দ্ব : হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির হতাশার কারণ উদ্ঘাটন করা এবং হতাশা ও দ্বন্দ্বের কুফল এবং তা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

১০. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি : অন্তঃক্ষরা গ্রন্থ নিঃসৃত রস বা হরমোন সরাসরি মানুষের রক্তের সাথে মিশে ব্যক্তির বিকাশ ও আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিসমূহ মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

১১. সামাজিক আচরণ : সামাজিক পরিবেশে ব্যক্তি কি ধরনের আচরণ করে তা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। শিশুর সামাজীকীকরণ, সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদি সামাজিক দিকসমূহ মনোবিজ্ঞানে আলোচিত হয়।

১২. আবেগ : আবেগ মনোবিজ্ঞানের অন্যতম বিষয়বস্তু। আবেগের ক্রমবিকাশ, আবেগকালীন ব্যক্তির দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

১৩. প্রাণী আচরণ : প্রাণী আচরণ সম্পর্কেও মনোবিজ্ঞানে তথ্য সংগৃহীত হয়ে থাকে। প্রাণী আচরণ মনোবিজ্ঞানে গবেষণার বিষয়বস্তু।

১৪. শিক্ষাক্ষেত্রে আচরণ : শিক্ষার আচরণ কেমন হবে, শ্রেণীবাদের, পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

১৫. উপদেশ ও নির্দেশনা : মানসিক অস্থিরতা, বৃত্তি নির্বাচন, ইত্যাদি আচরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপদেশ ও নির্দেশনা দিয়ে স্বাভাবিক আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া করতে ব্যক্তিকে মনোবিজ্ঞানীগণ সাহায্য করেন।

১৬. শিল্প ক্ষেত্রে আচরণ : শিল্প কারখানায় লোক নিয়োগ, বেতন প্রদান, পদোন্নতি, দূর্ঘটনা প্রভৃতি মনোবিজ্ঞানের শ্রাংলোচ্য বিষয় ।

১৭. অস্বাভাবিক আচরণ : অস্বাভাবিক আচরণ কি? এর প্রসার লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

১৮. চিকিৎসা ক্ষেত্রে : চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে মানসিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার কাজ সহজতর হয়েছে। তাই মানসিক রোগ, চিকিৎসা প্রণালী মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ব্যাপক। সকল শ্রেণীর আচরণই মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

 

মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। এর শাখাসমূহ বিশ্লেষণ কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের শাখাগুলো আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ ক্রমাগত নতুন আবিষ্কার করে চলেছে। মানুষ সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব বিধায় এটি সম্ভব হচ্ছে। তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের এ যুগে মনোবিজ্ঞানীরা ও নিত্যনতুন আবিষ্কার করে চলেছেন। তারা আজ.মানুষের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নিয়োজিত। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে মানুষ যা কিছু করে থাকে তার সবকিছু অর্থাৎ আচরণ নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। আর তাই ধীরে ধীরে উদ্ভব ঘটছে মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার।

মনোবিজ্ঞান : খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর সাহিত্য ও দর্শনে ‘মনোবিজ্ঞান’ শব্দটি পাওয়া যায়। মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Psychology। দুটি গ্রিক শব্দ Psyche এবং Logos থেকে ইংরেজি Psychology শব্দটির উৎপত্তি। Psyche অর্থ মন বা আত্মা এবং Logos শব্দের অর্থ বিজ্ঞান বা প্রজ্ঞা। শব্দগত অর্থে মনোবিজ্ঞান হচ্ছে মনের বিজ্ঞান।

১৮৭৯ সালে উইলহেম উন্ড বলেন, “মনোবিজ্ঞান হলো চেতনার বিজ্ঞান।”

আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন ১৯১৩ সালে মনোবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা প্রদান করেন। তাঁর মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান।”

রডিজার ও তাঁর সঙ্গীদের (১৯৮৪) মতে, “মনোবিজ্ঞানকে আচরণ ও মানব জীবনের সংগঠিত অনুধ্যান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।”

ক্রাইডার ও তাঁর সঙ্গীদের (১৯৯০) মতে, “মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াসমূহের বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনা।”

মনোবিজ্ঞানের শাখাসমূহ : মনোবিজ্ঞানে আলোচনার বিষয় হলো জীবিত প্রাণীর আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জ্ঞান লাভ করা এবং মানবজীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ করা। আধুনিক মনোবিজ্ঞান একটি বহুল পরিচিত ও গবেষণাসমৃদ্ধ বিজ্ঞান। তারা মানবজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে। এসব গবেষণাকে কেন্দ্র করে মনোবিজ্ঞানের নতুন শাখার উদ্ভব। শাখাসমূহ হলো :

১. সাধারণ মনোবিজ্ঞান,

২. চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান,

৩. উপদেশনা ও নির্দেশনা মনোবিজ্ঞান,

৪. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান,

৫. শিক্ষা মনোবিজ্ঞান,

৬. শিল্প মনোবিজ্ঞান,

৭. প্রকৌশল মনোবিজ্ঞান,

৮. শিশু মনোবিজ্ঞান,

৯. সমাজ মনোবিজ্ঞান,

১০. বিকাশ মনোবিজ্ঞান,

১১. অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান,

১২. শারীরবৃত্তীয় মনোবিজ্ঞান,

১৩. প্রাণী মনোবিজ্ঞান,

১৪. পরিসংখ্যান মনোবিজ্ঞান,

১৫. শব্দ মনোবিজ্ঞান।

নিম্নে মনোবিজ্ঞানের শাখাগুলো বিশ্লেষণ করা হলো :

১. সাধারণ মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানের সকল শাখার সম্মলিত রূপ হলো সাধারণ মনোবিজ্ঞান সাধারণ মনোবিজ্ঞান আচরণের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন- শিক্ষা, স্মৃতি, প্রত্যাশা ইত্যাদি সম্বন্ধে আলোচনা করে থাকে। আর মনোবিজ্ঞানের সকল শাখার আলোচ্য বিষয়কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দান করা সাধারণ মনোবিজ্ঞানের কাজ।

২. চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানের এই শাখার কাজ হলো মানসিক রোগের সংজ্ঞায়িত করা রোগ নির্ণয় করা, চিকিৎসা করা, রোগের কারণ নির্ণয় করা ও চিকিৎসা সম্পর্কিত গবেষণা পরিচালনা করা।

৩. উপদেশনা ও নির্দেশনা মনোবিজ্ঞান : তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নির্দেশনা ও উপদেশনা মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ প্রদান করে ব্যক্তির সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন। যেমনছাত্রছাত্রীদের বিষয় নির্বাচন, হতাশা, দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ইত্যাদি।

৪. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানী : পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা। এ শাখা পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সংগৃহীত তথ্যের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে। পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানীর কাজ হলো পরীক্ষণের সাহায্যে আবরণের তথ্য প্রদান করা।

৫. শিক্ষা মনোবিজ্ঞান : শিক্ষার্থী, শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষার পরিবেশ এসব শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়। শিক্ষার্থীর মেধা, প্রবণতা, সম্ভাবনা, পরিপক্কতা অনুযায়ী তার মধ্যে কেমন পরিবর্তন আনা যায় শিক্ষা মনোবিজ্ঞান তার সমাধান দেয়। শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে এসব শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়।

৬. শিল্প মনোবিজ্ঞান : শিল্প কলকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষকে সামনে রেখে শিল্প মনোবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটছে। উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত লোক নিয়োগ সংস্থাপন, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি কাজের মূল্যায়ন প্রভৃতি শিল্প মনোবিজ্ঞানে আলোচনা করা হয়ে থাকে। উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৭. প্রকৌশল মনোবিজ্ঞান : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে মনোবিজ্ঞানের এ শাখার উদ্ভব। প্রকৌশল মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো মানুষের ব্যবহার উপযোগী যন্ত্র তৈরি করা। প্রকৌশল মনোবিজ্ঞানীগণ এমন যন্ত্রপাতির নকশা করেন যাতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, দুর্ঘটনা হ্রাস পায় এবং মানুষের জন্য ব্যবহার আরামদায়ক হয়।

৮. শিশু মনোবিজ্ঞান : মনোবিজ্ঞানের এ শাখা শিশুর বিকাশ ও বৃদ্ধি সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। শিশু মনোবিজ্ঞানের পরিধি হলো মাতৃগর্ভে ভ্রুণের জন্ম মুহূর্ত থেকে শুরু করে যৌন পরিপক্কতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে ।

৯. সমাজ মনোবিজ্ঞান: মানুষ সামাজিক জীব। তাকে সমাজে বসবাস করার উপযোগী আচরণ করতে হয়। মানুষের সামাজিক আচরণই সমাজ মনোবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু ।

১০. বিকাশ মনোবিজ্ঞান : বিকাশ মনোবিজ্ঞান হলো মনোবিজ্ঞানের সেই শাখা, যে শাখায় ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সেই সকল পরিবর্তনের পার্থক্য পর্যালোচনা করা হয়।

১১. অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান: অস্বভাবী মনোবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যা অস্বভাবী আচরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক নির্ণয়, মূল্যায়ন, চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্বন্ধে আলোচনা করে থাকে।

১২. শারীরবৃত্তীয় মনোবিজ্ঞান : উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেয়া জীবের বৈশিষ্ট্য। উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেয়ার প্রতিক্রিয়াই হল আচরণ। আর আচরণের মূলে রয়েছে শারীরিক ভিত্তি।

১৩. প্রাণী মনোবিজ্ঞান : মানুষ ব্যতীত অন্যন্য প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে এ শাখায় তথ্য সংগৃহীত হয়।

১৪. পরিসংখ্যান: মনোবিজ্ঞান বহু সংখ্যক মানুষের আচরণ সম্পর্কিত তথ্য ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে

পরিসংখ্যানের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

১৫. শব্দ মনোবিজ্ঞান: শব্দ মনোবিজ্ঞান বর্তমানে মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অডিওলজি, ইনফরমেশন টেকনোলজি এসব বিষয় নিয়ে শব্দ মনোবিজ্ঞানে আলোচনা করা হয়ে থাকে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবনের সমস্যা সমাধানে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করাই মনোবিজ্ঞানের ফার্জ। আর তাই মনোবিজ্ঞানের শাখাসমূহও সেভাবেই বিস্তৃত হয়েছে। মানবজীবনে এসব শাখার গুরুত্ব অপরিসীম।

Leave a Comment