মনোবিজ্ঞান কি? মনোবিজ্ঞানের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ কি কি? বিশ্লেষণ কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ? মনোবিজ্ঞানের প্রধান প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ আলোচনা কর ।

উত্তর : 

ভূমিকা : সফলতার পিছনে ইতিহাস ঐতিহ্য থাকাটাই স্বাভাবিক। মনোবিজ্ঞান এমন একটি বিষয় যা চড়াই উতরাই করে। আজ একটি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। এখন মনোবিজ্ঞানীরা প্রায় প্রতিদিনই মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। জটিল থেকে জটিলতার সমস্যা সমাধানে মনোবিজ্ঞান প্রচেষ্টা চালায়।

মনোবিজ্ঞানের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ : উইলহেম উন্ড ও উইলিয়াম জেমস-এর উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য মনোবিজ্ঞান আজ স্বাধীন বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বহু যুগ পূর্বে মনোবিজ্ঞান দর্শনের কাছ থেকে পৃথক হলেও মনোবিজ্ঞানীদের কাজের মধ্যে আজও বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। মানুষের আচরণের প্রকৃতি ও বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ধারা। যেমন- কিছু সংখ্যক মনোবিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে, আমাদের শুধু আচরণ অনুধ্যান করা উচিত। মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু থেকে মনকে বাদ দিতে হবে। আবার অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন যে, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি আমাদের অনুধ্যান করা উচিত, যদিও এইসব বিষয় পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা বেশ কঠিন।

Also Read,

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তার স্কুলসমূহ হলো:

১. জৈব মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি,

২. মনোগতীয় বা মনঃসমীক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি,

৩. আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি,

৪. মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও

৫. জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি ।

নিম্নে এগুলো বিশ্লেষণ করা হলো :

১. জৈব মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : জৈব মনোবিজ্ঞান মূলত শারীরবিজ্ঞান। মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বয়ভাবে থাকে। জৈব মনোবিজ্ঞানের মূল বক্তব্য হলো যে, প্রতিটি আচরণ চিন্তন ও অনুভূতির সাথে মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। জৈব মনোবিজ্ঞানের লক্ষ হচ্ছে মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় কাজ করে। যেমন বানরের মস্তিষ্কের বিশেষ এলাকায় অস্ত্রপাচার করে দেখা গেছে যে, আক্রমণাত্মক বানর খুব শান্ত ও ঘটনা ও মনোবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্ক বুঝতে পারা বা ব্যাখ্যা করা। তারা জানতে চান যে মস্তিষ্কের কোনো অংশ কিরূপ নম্র হয়ে গেছে।

২. মনোগতীয় বা মনঃসমীক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি : মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল বক্তব্য হলো, মানব আচরণকে অনুধ্যানে অবচেতন শক্তি বা মনোগতির অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ফ্রয়েডীয় ও অন্যান্য মতবাদের সমন্বয়ে গঠিত হলেও এটি প্রকৃতপক্ষে ফ্রয়েড এবং তাঁর অনুসারী, নব্য ফ্রয়েডীয়দের কাজের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ভিয়েনার চিকিৎসক সিগমন্ড ফ্রয়েড মানসিক রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তা মনঃসমীক্ষা নামে পরিচিত। ফ্রয়েড মনঃসমীক্ষা শব্দটি তাঁর মনোবৈজ্ঞানিক মতবাদ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে প্রয়োগ করেছেন। মনঃসমীক্ষা তত্ত্বের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো মানুষ কতকগুলো অবচেতন প্রেষ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা যে কোনোভাবে প্রকাশ পায়। কোনো প্রেষ সামাজিকভাবে প্রত্যাশিত হলে তা কোন না কোনভাবে অর্থাৎ পরোক্ষভাবে অবদমিত ইচ্ছা প্রকাশিত হবে।

৩. আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি : উইলহেম উন্ডের অন্তদর্শন পদ্ধতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটেছে। আচরণবাদীদের দৃষ্টিতে অন্তদর্শনের মাধ্যমে চেতনাকে অনুধ্যান করা খুবই অবৈজ্ঞানিক। তাঁদের মতে, মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এর বিষয়বস্তু অবশ্যই পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে। যেমন- 

আচরণ : এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীরা মনোবিজ্ঞানকে আচরণের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং তারা চেতনা ও দর্শনের অন্যান্য বিষয় বা পর্যবেক্ষণযোগ্য নয় তা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু থেকে বাদ দেন। এ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন- আইভান পেট্রোডিচ্ প্যাভলড, এডওয়ার্ড এল, থর্নডাইক, জন. বি. ওয়াটসন প্রমুখ ।

৪. মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি : মনঃসমীক্ষা ও আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির ত্রুটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরবর্তী কয়েক দশকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে রয়েছে তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং চিত্তাকর্ষক শক্তি। কিন্তু এতে ব্যক্তির গুরুত্ব আছে বলে মনে হয়নি। সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া এবং ছদ্মবেশী তাড়নার জন্য ব্যক্তিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির সমগ্র দিক যেমন অনুভূমি, অভিজ্ঞতা, চাহিদা, সমস্যা মনঃসমীক্ষা ও আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির বিবেচনায় আসেনি। এই প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৃতীয় শক্তি নামে মানবিক মনোবিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমগ্র ব্যক্তির উপর জোর দেয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর গুরুত্ব আরোপ করে। মানবিক মনোবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় ধারণা হল আত্মোপলব্ধির চাহিদা। এটা স্বীকৃত যে, অনেক প্রেষণা ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করে। এ মনোবিজ্ঞানে দুজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন আব্রাহাম ম্যাসলো এবং কার্ল রজার্স।

৫. জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি : পরিজ্ঞান সম্পর্কিত অনুধ্যান হলো আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন ধারা আমাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কিত তথ্যের গান্তর বা প্রক্রিয়াকরণকে পরিজ্ঞান বলে। আচরণবাদীগণ যখন মানসিক জীবন এবং চেতনাকে মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই প্রতিক্রিয়া হিসেবে জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে। উন্ডের অন্তদর্শনবাদ এবং আরো পূর্বে এরিস্টটলের কল্পনা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত প্রাচীন লেখায় এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীগণ জানতে চান যে, আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি তা কিভাবে সংগঠিত তা বুঝতে পারি ।

উপসংহার : পরিশেষে বলতে পারি যে, বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্ন ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তাই তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য বিদ্যমান। তথাপি মনোবিজ্ঞান একটি আচরণ সম্পর্কীয় বিজ্ঞান। কেননা এখানে আচরণকে কেন্দ্র করে মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয়েছে।

Leave a Comment