ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা কি? বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা আলোচনা কর

অথবা, ভূমি সংস্কার বলতে কি বুঝ? বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা: বিশ্বের প্রতিটি দেশেই একটি ভূমি ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি ব্যবস্থা একদিকে যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তেমনিভাবে এটি অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। যেমন বৃহৎ খামার চাষাবাদের জন্য পুঁজি প্রয়োজন হয়। যাদের জমি আছে তারা জমি বর্গা দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে যাদের জমি নেই তারা জীবিকার তাগিদে জমি বর্গা নেয়। এভাবেই ভূমি ব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য বিদ্যমান থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থায় কোন ভারসাম্য নেই। বিভিন্ন তথ্যে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে শতকরা ৫০ ভাগ জমি শতকরা ১০ ভাগ লোকের অধিকারে রয়েছে। এদেশে লাঠি এবং ক্ষমতার জোরে চর এবং ভূমি দখল হয়। শুধু রাজধানী ও তাঁর আশপাশে ১০ হাজার একর সরকারি জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। ভূমি ব্যবস্থায় সব রকম বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা দূরীকরণের উপায় হচ্ছে ভূমি সংস্কার।

ভূমি সংস্কার : ভূমি সংস্কার বলতে বুঝায় দেশে ভূমি ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করে মালিকানা ও ব্যবহার সম্পর্কিত আইন কানুনের সংস্কার করাকে। ভূমি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভূমিতে কৃষক শ্রেণির মালিকানা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশের মত কৃষি প্রধান দেশে ভূমি সংস্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে এদেশের রেকর্ড পরিমাণ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভূমি ব্যবস্থার মেরুকরণ প্রবণতা ভূমি সংস্কার দু’ভাবে হতে পারে । যথা :

(ক) বণ্টনধর্মী : এ ধরনের ভূমি সংস্কারে ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি দেশের ভূমিহীন চাষী ও ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বণ্টন করে। এক্ষেত্রে লাঙ্গল যার জমি তার নীতি অনুসৃত হবে।

(খ) যৌথধর্মী : যৌথধর্মী ভূমি সংস্কারের ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করে সরকারি মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষি ভূমিকে যৌথ খামার বা রাষ্ট্রীয় খামারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা। এখানে কৃষক শ্রেণি তাদের সাধ্য অনুযায়ী শ্রম দিবে এবং প্রয়োজনানুযায়ী পারিশ্রমিক বা ফসলাদি পাবে। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সরকারের খাদ্য ব্যয় হবে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমনকি বিদ্যমান ছিল। যৌথধর্মী ভূমি সংস্কার নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক একটি প্রক্রিয়া। বর্তমানের সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বাংলাদেশে যৌথধর্মী ভূমি সংস্কার খুব একটা সহজ নয়, হয়ত সম্ভবও নয়।

বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা : ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে জমিদারী প্রথা চালু করে স্যার ফ্লাউড-এর অধীনে একটি কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের বেশির ভাগ সদস্যরাই এ জমিদারী প্রথা বিলোপের সুপারিশ করলেও ব্রিটিশ সরকার তা করেনি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করার পরে ১৯৫০ সালে নতুন সরকার ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনয়ন করে। এ পরিবর্তনকে ১৯৫০ সালের ভূমি সংস্কার আইন নামে অভিহিত করা হয়। এ আইনের অধীনে পূর্ববাংলার জমিদারি প্রথা এবং প্রজাস্বত্ব আইনে যে সকল পরিবর্তন ও সুপারিশ গৃহীত হয় তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :

১. জমিদার, জোতদার, তালুকদারি প্রথা, হাওলাদারি ইত্যাদি সব ধরনের প্রথার বিলোপ করা হয়। সরকার চাষীদের কাছ থেকে সরকারি ভূমি কর ও মৎস্য কর আদায় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

২. সরকার প্রত্যেক পরিবারকে ১০০ বিঘা বা মাথাপিছু ১০ বিঘা জমি ভোগ দখল করার অনুমতি দেয়। এ থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত জমি সরকার নিজ দখলে রাখে। তাছাড়া প্রতি পরিবারকে বসতবাড়ির জন্য ১০ বিঘা পর্যন্ত জমি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়।

৩. সরকারি জমি ৩ বিঘার নিচে জমির মালিককে বিতরণ করার কথা বলে, কারণ তিন বিঘার নিচে জমির মালিককে সে সময় ভূমিহীন বলা হতো।

৪. জমির মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যবহৃত হবে এবং হস্তান্তর করা যাবে।

৫. কোন কৃষক বা জমির মালিক জমি বিক্রি করতে চাইলে প্রথমত তার ওয়ারিশদার এবং পরবর্তীতে জমির মালিক নয় কিন্তু চাষী যে, সেই জমি ক্রয় করার অগ্রাধিকার পাবে।

৬. কৃষকের কাছ থেকে মোট উৎপাদনের এক দশমাংশ খাজনা নেয়া হবে বা পূর্বের খাজনার ৫ অংশ খাজনা দিতে হবে। ৩০ বছর পর্যন্ত খাজনার এ রেওয়াজ বলবত থাকবে।

৭. ১৯৫০ সালের ভূমি সংস্কার আইন জমির বিভক্তিকরণের কথা বললেও 8 অংশ কৃষক জমি একত্রীকরণের ব্যবস্থা করতে সরকার সাহায্য করবেন।

৮. প্রত্যেক কৃষক ততদিন পর্যন্ত জমির পূর্ণ ব্যবহার পাবেন যতদিন পর্যন্ত সময়মত খাজনা পরিশোধ করে। করতে পারবে না।

৯. চাষী ব্যতীত অন্য কোন জমি ক্রয়

১০. কোন জমির মালিক অকৃষক জমি বিক্রি যা হস্তান্তর করলে তা পূর্ববর্তী মালিক ক্ষতিপূরণ পাবে। তবে এ ক্ষতিপূরণের অর্থ ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য হবে যা নগদ অর্থে বা যন্ত্রের মাধ্যমে দেয়া হবে। সেখানে ৩% সুদের হার প্রযোজ্য হবে।

১৯৫০ সালের ভূমি সংস্কারের এ আইন ১৯৬০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকে। পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুবাধে ১৯৬০ সালে এক অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে যাকে ১৯৬০ সালের ভূমি সংস্কার অর্ডিন্যান্স নামে অভিহিত করা হয়। ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন আনয়ন করা হয়।

সুদীর্ঘ সময় বাংলাদেশ পরাধীনতার বন্দিশালায় থাকার পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন এখানকার সমাজ কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচিত হয়। এ পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার নীতিতেও সমানভাবে প্রভাবিত হয়। কেননা ১৯৭২ সালে এবং ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার স্বচ্ছতা ও স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি করতে সংস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করে।

উপসংহার : বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ভূমি। পেশাগত দিক থেকে কৃষি সর্বশীর্ষে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এ দু’টিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। তাই ভূমি সংস্কারের গুরুত্ব অপরিসীম।

Leave a Comment