ভূমি সংস্কার কি? ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার নীতি আলোচনা কর

উত্তর : 

ভূমিকা : বিশ্বের প্রতিটি দেশেই একটি ভূমি ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি ব্যবস্থা একদিকে যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তেমনিভাবে এটি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যেমন বৃহৎ খামার চাষাবাদের জন্য পুঁজি প্রয়োজন হয়। যাদের বেশি আছে তারা জমি বর্গা দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে যাদের জমি নেই তারা জীবিকার তাগিদে জমি বর্গা নেয়। এভাবেই ভূমিব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য বিদ্যমান থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থায় ভারসাম্য নেই। আর এ ভূমি ব্যবস্থার সব রকম বৈষম্য তূর করে ভারসাম্য বজায় রাখার উপায় হচ্ছে ভূমি সংস্কার।

ভূমি সংস্কার : ভূমি সংস্কার বলতে বুঝায় দেশে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করে মালিকানা ও ব্যবহার সম্পর্কিত আইনকানুনের সংস্কার করাকে। ভূমি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভূমিতে কৃষক শ্রেণির মালিকানা ও অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মতো কৃষি প্রধান দেশে ভূমি সংস্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে এদেশের রেকর্ড পরিমাণ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভূমি ব্যবস্থার মেরুকরণ প্রবণতা ভূমি সংস্কারকে অনিবার্য করে তুলেছে। ভূমি সংস্কার দু’ভাবে হতে পারে। যথা :

(ক) বণ্টনধর্মী : এ ধরনের ভূমি সংস্কারে ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চসীমা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি দেশের ভূমিহীন চাষী ও ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বণ্টন করা। এক্ষেত্রে লাঙ্গল যার জমি তার নীতি অনুসৃত হবে।

(খ) যৌথধর্মী : যৌথধর্মী ভূমি সংস্কারে ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করে সরকারি মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষি ভূমিকে যৌথ খামার বা রাষ্ট্রীয় খামারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা। এখানে কৃষক শ্রেণি তাদের সাধ্য অনুযায়ী শ্রম দিবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পারিশ্রমিক বা ফসলাদি পাবে। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সরকারের খাদ্য গুদামে জমা হবে এবং দেশের প্রয়োজনে ব্যয় হবে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমনটি বিদ্যমান ছিল। যৌথধর্মী ভূমি সংস্কার নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক প্রক্রিয়া বর্তমানের সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বাংলাদেশে যৌথধর্মী ভূমি সংস্কার খুব একটা সহজ নয় হয়ত সম্ভব ও নয়।

১৯৭২ সালের ভূমি সংস্কার নীতি : ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের পটভূমিতে বাংলাদেশে স্বাধীনতা লাভের পরপর ভূমি সংস্কারের দিকে নজর দেয়। এ লক্ষ্যে সরকার ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার নামে একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ মন্ত্রণালয় ভূমি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে। এ সময়ে প্রাথমিকভাবে যে সিদ্ধান্তগুলো প্রণীত হয় সেগুলো হচ্ছে :

১. দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ সাল থেকে ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ না হয়।

২. কোন পরিবার সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা পর্যন্ত দখলে রাখতে পারবে। সর্বোচ্চ সীমার অধিক জমি সরকার দখল করে ক্ষুদ্র ও ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে। সরকারের খাস জমিও এ বণ্টন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।

৩. যোগ্য লোকদের মধ্যে কোন প্রকার সেলামী ছাড়াই জমি বণ্টন করা হবে। জমি বণ্টনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হবে, যাদের মধ্যে জমি বন্টিত হবে তাদের কেউই যেন বসতবাড়িসহ সর্বোচ্চ দেড় একরের বেশি জমি না পায়।

৪. এ আইনের মাধ্যমে দেশে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত নিবর্তনমূলক ইজারা প্রথা বিলোপ করা হয়। হাট-বাজার, জলমহাল ইত্যাদি ইজারা দেয়ার প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

৫. সরকার চরাঞ্চলের মালিকানা গ্রহণ করে। কোথাও নতুন চর জেগে উঠলে সে চরের সমস্ত জমি সরকারি তত্ত্বাবধানে ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৬. ১০০ বিঘার উদ্বৃত্ত জমি সরকারের হাতে নিয়ে ক্ষুদ্র ও ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন করা। এ বণ্টনে জমির আয়তন হবে ১.৫ একরের কম।

৭. সরকারি ইজারাদারী প্রথা বিলুপ্ত করেন এবং অকৃষিকে কৃষি থেকে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন।

৮. ভূমি প্রশাসন ও ভূমিমন্ত্রণালয় স্থাপন।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, এদের জমির তুলনায় মানুষ এত বেশি যে, অনেকে লোকসান দিয়েও জমি চাষ করতে অগ্রসর হয়। সামগ্রিক অর্থে এ দেশে কৃষক অনুকূল ভূমি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন মৌলিক ও গতিশীল ভূমি সংস্কার। বাস্তবায়নযোগ্য ভূমি সংস্কার এবং কৃষি কল্যাণ নীতি গ্রহণ করলেই এদেশের ভূমি ব্যবস্থা ও কৃষি উৎপাদন নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।

Leave a Comment