বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে কি বুঝায়? বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যাবলি আলোচনা কর।

অথবা, দৃষ্টিভঙ্গির সংজ্ঞা দাও। বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিসমূহ তুলে ধর।

উত্তর : 

ভূমিকা : আধুনিক মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞান বর্তমানে একটি বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান হিসেবে পরিগণিত। মনোবিজ্ঞান কোন ধরনের বিজ্ঞান তা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান নির্ভর বলা হয়ে থাকে। মনোবিজ্ঞান শুধু আচরণের সম্বন্ধে মৌলিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এর ব্যবহার কি ও প্রয়োগ দিক সম্পর্কেও আলোচনা করে থাকে। মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করার জন্য।

মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান। এবং মানুষের সমস্যায় এ জ্ঞানের প্রয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। মনোবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Psychology’ কথাটি এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে। যার আভিধানিক অর্থ হলো আত্মা সম্পর্কিত বিজ্ঞান। মনোবিজ্ঞান হলো আচরণ ও অভিজ্ঞতার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান এবং মানুষের সমস্যায় জ্ঞানের প্রয়োগ।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মনোবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। 

নতুন জ্ঞানকে গ্রহণকারী : তত্ত্ব ও তথ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। বিজ্ঞান সম্পূর্ণ হতে পারে না। কারণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি ক্রমবর্ধমান। আমরা মনোবিজ্ঞানে প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে আজ যেসব তত্ত্ব ও তথ্য জানি। কিছু দিন পরে নতুন গবেষণার ফলে সেগুলোতে আরও নতুন সংযোজন হবে সন্দেহ নেই।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যথা

(ক) প্রগতিশীলতা, 

(খ) অনুসন্ধিৎসা, 

(গ) সন্দেহপ্রবণতা।

প্রাথমিক পর্যায়ে মনোবিজ্ঞানকে আত্মা বা মনকে বাদ দিয়ে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি : কোন বিষয় বিজ্ঞান কিনা তা নির্ভর করে চারটি ঘটনার বা বিষয়ের উপর। নিচে সেগুলো আলোচনা করা হলো। যথা

১. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কিছু নীতি আছে, নিচে দেয়া হলো। যথা

(ক) কার্যকরী সংজ্ঞা : বৈজ্ঞানিক যখন কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে গবেষণা করেন তখন তিনি উক্ত বিষয়ের একটি কার্যকরী সংজ্ঞা প্রদান করেন। মনোবিজ্ঞানী প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে গবেষণা করেন। প্রাণীর বহুবিধ আচরণের মধ্যে থেকে একটি মাত্র আচরণ বা প্রতিক্রিয়াকে তিনি পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন করেন। কার্যকরী সংজ্ঞা ছাড়া গবেষণার না। মনোবিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয়বস্তু অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো দ্ব্যার্থহীন সিদ্ধান্ত পাওয়া বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রাণীর আচরণ। তিনি প্রাণীর বহুবিধ আচরণের মধ্যে যে আচরণটি গবেষণার জন্য বেছে নেন, তা সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।

(খ) পুনরাবৃত্তি : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো পৌণঃপুনিক পর্যবেক্ষণ। বিজ্ঞান কখনও একটি মাত্র পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হন না। মনোবিজ্ঞানী কোনো একটি আচরণকে বার বার পর্যবেক্ষণ করেন। সুতরাং আচরণটি এমন হতে হবে যেন এটির পুনরাবৃত্তি ঘটে। যে সব ঘটনা একবার মাত্র ঘটে সে সব ঘটনা নিয়ে বিজ্ঞান বিশেষ আগ্রহী নন। পুনরাবৃত্তি ঘটে এমন আচরণেই কার্যকরণ আবিষ্কার করা সম্ভব। যে সব আচরণ বার বার ঘটে মনোবিজ্ঞানী সে ধরনের একটি আচরণকে পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করেন এবং লিপিবদ্ধ করেন। বিজ্ঞানী যখন কোনো পরীক্ষণ কার্য পরিচালনা করে, তখন একটি মাত্র পরীক্ষণের উপর নির্ভর করে বহু সংখ্যক পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি করে তবে কোনো ফলাফল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ।

(গ) ব্যক্তি নিরপেক্ষতা: মনোবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রাণীর আচরণ এবং এই আচরণ ব্যক্তি নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। প্রাণীর এই আচরণ কোনো গবেষক যেভাবে অনুসন্ধান করতে পারেন। অন্যরাও তদ্রুপ পারেন। এই ধরনের ব্যক্তি নিরপেক্ষতার কারণেই মনকে বাদ দিয়ে প্রাণীর আচরণকে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ঠিক করা হয়েছে। পরীক্ষণের পরিকল্পনা ও আয়োজন পরীক্ষণ ও পরীক্ষণকারী ভেদে অভিন্ন রেখে পরীক্ষণের ফলাফলকে পরীক্ষণকারীর প্রভাব মুক্ত রাখাই ব্যক্তি নিরপেক্ষতা।

(ঘ) নিয়ন্ত্রণ : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পর্যবেক্ষণ। বিজ্ঞানী যখন কোনো আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন, তখন তিনি গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশই তাই করে থাকেন। মনোবিজ্ঞানীর উদ্দেশ্য হলো আচরণের কার্যকারণ আবিষ্কার করা। পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সাধারণত অনির্ভরশীল চল প্রয়োগ করে নির্ভরশীল চলে কি পরিবর্তন আসে তা লক্ষ্য করা হয়। যেমন- বাইরের শব্দ বা কোলাহল, আলোর তীব্রতা, বাষ্পের তাপমাত্রা প্রভৃতি বাহ্যিক চল যেন পরীক্ষণ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে না পারে তা লক্ষ্য রাখতে হবে। পরীক্ষণের নিয়ন্ত্রণ বোঝায় অনির্ভরশীল চলের সঙ্গে নির্ভরশীল চলের সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে অনুধাবনের উদ্দেশ্যে সব রকম অবাঞ্ছিত চলকে নিয়ন্ত্রণ করে পরীক্ষণকার্য পরিচালনা করা। মনোবিজ্ঞানীগণ পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে জীবের দাচরণ গবেষণা করেন।

(ঙ) সাধারণীকরণ : ‘অল্পসংখ্যক দৃষ্টান্ত থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়াকে সাধারণীকরণ বলে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় গবেষক মানুষ বা প্রাণী সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব বা সূত্র প্রণয়ন করেন।

(চ) যথার্থতা প্রমাণ : বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যথার্থতা প্রমাণ, অর্থাৎ কোনো বৈজ্ঞানিক তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করার পর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীগণ তার হুবহু পুনরুৎপাদন করে ফলাফল যাচাই করে দেখতে পারেন। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ও যে-কোনো মনোবিজ্ঞানী পুনরায় হুবহু পুনরুৎপাদন করে তার সত্যতা যাচাই করে দেখে থাকেন।

২. বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : বিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে বোঝায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বহির্ভূত জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে না থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়কে বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা। এতে তত্ত্ব ও তথ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানীর থাকতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানীগণ পুরাতন তথ্যকে বর্জন করে নিত্য নতুন তথ্য আহরণে সদা নিয়োজিত প্রাথমিক পর্যায়ে মনোবিজ্ঞানকে আত্মা বা মনের বিজ্ঞান বলা হত। তবে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয় সে জন্য আত্মা বা মনকে বাদ দিয়ে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৩. বিষয়বস্তু : সব বিজ্ঞানেরই একটি মূল বিষয় হচ্ছে যে বিজ্ঞান যে বস্তু বা ঘটনার অনুধ্যান করে তা নিয়ম সাপেক্ষ। বিজ্ঞানের কতকগুলো বিষয়বস্তু থাকে। সেগুলোর আবার কতকগুলি বৈশিষ্ট্য থাকে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা

(ক) বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে ।

(খ) বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে গবেষকগণ একে অপরের সাথে ভাষার সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।

(গ) বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে প্রমাণযোগ্য হতে হবে।

(ঘ) মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো আচরণ। মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ খুব ভালভাবেই পূর্ণ করে। সুতরাং বিষয়বস্তুর দিক থেকে মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা যায়।

৪. প্রয়োগশীলতা : বিজ্ঞানের আর একটি মাপকাঠি হলো এরূপ প্রয়োগ বা ব্যবহার। যে জিনিস বা বিষয়কে বাস্তবে প্রয়োগ বা ব্যবহার করা যায় না তাকে যথাযথ বিজ্ঞান বলা যায় না। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বা সূত্র জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের ব্যবহার বহুমুখীভাবে জানা যায়। শিল্প কারখানায়, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ জীবন, ব্যক্তিগত জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন প্রভৃতি প্রায় সব ক্ষেত্রেই মনোবিজ্ঞানের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বলা যায় যে, শিল্পক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিশ্রম সহজতর করা হচ্ছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান নির্ভর মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগের ফলে মানসিক রোগের কারণ এবং তা নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োগের ফলে শিক্ষাদান ও শিক্ষণের সুষ্ঠু পদ্ধতির উদ্ভব হচ্ছে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে বিজ্ঞান নির্ভর হওয়ায় পড়াশোনার মধ্যে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে পূর্বের অবস্থা থেকে। এমনিভাবে সমাজ জীবনে রাষ্ট্রীয় জীবনে ও ব্যক্তিগত জীবনের সর্বক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানকে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সুতরাং মনোবিজ্ঞান আজকাল একটি প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।

উপসংহার : পরিশেষে উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, আধুনিক মনোবিজ্ঞান একটি বহুল পরীক্ষিত ও গবেষণাসমৃদ্ধ বিজ্ঞান। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে অনুধ্যান করতে গিয়ে মনোবিজ্ঞান পরীক্ষণ ও নিরীক্ষণ পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করে থাকে। তথ্য ও তত্ত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে কোনো বিষয়বস্তুকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গি এ বিজ্ঞানের আছে।

Leave a Comment