সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় বিবেচ্য নৈতিক দিকগুলো পর্যালোচনা কর

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার যেসব নৈতিক দিকগুলো মেনে চলা হয় তা আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানব সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছে। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বিজ্ঞান তার আধুনিকতার ছোয়া রাখেনি। বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ছোয়া বিদ্যমান। এর সাথে মানুষের মনোজগতকে জানতেও মনোবিজ্ঞান থেমে নেই। মনোবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। মানুষে আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া জানতে মনোবিজ্ঞানে একাধিক পদ্ধতির ব্যবহার রয়েছে। তবে মনোবিজ্ঞানে এমনও অনেক পদ্ধতি রয়েছে যেখানে নৈতিকতার বিষয়টি গৌণ। এজন্য মনোবিজ্ঞান তার বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার জন্য নৈতিকতার উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে।

সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় বিবেচ্য নৈতিক দিক : সমাজ মনোবিজ্ঞান একটি বৃহৎ গবেষণামূলক বিজ্ঞান। মানুষের আচরণ থেকে শুরু করে মানব জীবনের প্রতিটি বিষয় সমাজ মনোবিজ্ঞানের গবেষণার অন্তর্ভুক্ত। আর মানব জীবনের বিভিন্ন বিষয় গবেষণার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ যেসব নৈতিক দিকগুলোকে বিবেচ্য হিসেবে গ্রহণ করেন তা হলো :

১. তথ্য প্রদানকারীর অধিকার : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি উত্তরদাতার গবেষণার অংশ গ্রহণ করা বা না করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এছাড়া তিনি কোনো তথ্য গোপন করতে চাইলে তাকে কোনো প্রকার পীড়াপীড়ি করা যাবে না। তিনি বিরক্ত হতে পারেন এমন প্রশ্ন করা থেকে গবেষককে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি বিষয়ে অংশগ্রহণকারীকে পূর্ণ অধিকার দিয়ে তার থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এটা প্রতিটি গবেষকের নৈতিক দায়িত্ব ।

২. পরীক্ষণ পাত্রের ক্ষতিপূরণ পাবার অধিকার সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার জন্য প্রতিটি পরীক্ষণ পাত্রের ক্ষতিপূরণ পাবার পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কিংবা তা প্রকাশে উত্তরদাতা বা তথ্য সরবরাহকারী সামান্যতম ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় পরীক্ষণ পাত্রের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা গবেষকের নৈতিক দায়িত্ব।

৩. পরীক্ষণ পাত্রের পরীক্ষণ থেকে প্রত্যাহারের অধিকার সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার পরীক্ষণের যে কোনো পর্যায়ে থেকে পরীক্ষণজনিত প্রত্যাহার ক্ষমতা থাকতে হবে। যাতে করে উত্তরদাতা তার ইচ্ছামত তথ্য প্রদান করতে বা নাও করতে পারে। এজন্য তার স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। যাতে করে প্রতিটি উত্তর প্রদানকারী মুক্তভাবে তথ্য প্রদান করতে পারেন। তা যাতে তত্ত্বাবধান করতে পারে সেজন্য তা উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যাতে গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য নির্ভুল ও সঠিক হতে পারে।

৪. গবেষণা প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান : গবেষণার জন্য যিনি তথ্য সংগ্রহ করবেন তিনি তা পর্যালোচনার করার পর।

৫. গবেষণা সম্পর্কে ধারণা পাবার অধিকার : প্রতিটি তথ্য সরবরাহকারীর এ অধিকার থাকতে হবে যে, গবেষকের পরিচিতি, গবেষণার উদ্দেশ্য, গবেষণার উপকারিতা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি জানতে পারবেন। গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে জানার পর যদি তিনি তথ্য প্রদানে রাজি হন তবেই গবেষক তার দিক থেকে তথ্য নিতে পারবেন নতুবা না।

৬. প্রাপ্ত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদানকারীকে এ নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে যে তার দেওয়া তথ্যগুলো শুধুমাত্র গবেষণা কাজে ব্যবহার করা হবে। এবং তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। এছাড়াও তার অনুমতি ব্যতীত তা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার ও প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনে এজন্য তথ্য প্রদানকারীর লিখিত অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।

৭. তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য জানার অধিকার : প্রতিটি তথ্য সরবরাহকারীর তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য জানার অধিকার রয়েছে। এজন্য প্রতিটি তথ্য সরবরাহকারীকে কি উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে তা বুঝিয়ে বলতে হবে। যাতে ব্যক্তি তথ্য প্রদানের মাধ্যমে তার কষ্ট লাঘব করতে পারে।

৮. পরিচয় গোপন রাখা সমাজ মনোবিজ্ঞান মানসিক বিজ্ঞান। মানুষকে নিয়েই এর গবেষণা পরিচালিত হয়। এজন্য গবেষক যাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবেন, তাদের পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখতে হবে। প্রয়োজনে ছদ্মনাম ব্যবহার করা যেতে পারে। যাতে তথ্য সরবরাহকারী সামাজিকভাবে সম্মানহানি কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সম্মুখীন না হন।

৯. মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন না হওয়া : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা করতে গিয়ে পরীক্ষণপাত্র যাতে করে কোনো প্রকার মাসিক চাপে না পড়েন কিংবা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তথ্য প্রদানের পূর্বে তার মানসিক অবস্থা যেমন ছিল তথ্য প্রদানের পরেও যেন তেমন অবস্থা থাকে সেদিকে নিশ্চিত হয়ে তার নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

১০. পক্ষপাতহীন তথ্য সংগ্রহ করা : সমাজ মনোবিজ্ঞান একটি sensitive গবেষণামূলক বিজ্ঞান। এতে পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। তবে কোনো কারণে যদি গবেষকের দ্বারা তা পক্ষপাতিত্ব হয়ে থাকে তবে তা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কাজেই তথ্য সংগ্রহের সময় গবেষককে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে সঠিক ও বাস্তবসম্মত, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। যেন তা বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় ।

১১. স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে এমন পরিস্থিতি বর্জন করা : সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণা করতে গিয়ে অংশগ্রহণকারীর স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে। একই সাথে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে এমন গবেষণা চালিয়ে নেবার জন্য নিম্নতর প্রাণীর উপর গবেষণা চালনা করা যেতে পারে।

১২. শিশু ও প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবহার : শিশু এবং মানসিক প্রতিবন্ধী প্রতিটি ব্যক্তি মানসিকভাে বোধশক্তিহীন। তাই তাদের ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তারা যাতে করে কোনো প্রকার ভয় না পায় তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে গবেষণা পরিচালনা করতে হবে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় সচেতন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এজন্য প্রতিটি সমাজ মনোবিজ্ঞানী তাদের গবেষণার জন্য নৈতিক দিকগুলো বিবেচ্য হিসেবে বিবেচনা করে অত্যন্ত সচেতন থেকে গবেষণা কার্য পরিচালনা করেন। এজন্য গবেষণা কাজ পরিচালনার সময় পরীক্ষণপাত্র যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হন তা বিবেচনা ও নিশ্চিত হয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও গবেষণার সার্বিক বিষয়ে অবগত হয়ে যদি উত্তরদাতা তথ্য প্রদান করে তবেই তাদের নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে নতুবা কোনো বিষয়ে কাউকে পীড়াপীড়ি করা যাবে না ।

Leave a Comment