বিজ্ঞান বা প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা কর।

উত্তর :  ভূমিকা : বিজ্ঞান শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান। সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধভাবে গবেষণালব্ধ বিশেষ জ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে। মনোবিজ্ঞানে জীবিত প্রাণীর আচরণ নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় এবং সেই আচরণ সামাজিক পরিবেশ দ্বারা ও প্রভাবিত হয়। তাই মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান বলা হয় । বিজ্ঞান বা প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য : Blair J. Kolasa তাঁর ‘Introduction to Behavioural Science’ গ্রন্থে বিজ্ঞানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা ১. বিজ্ঞান পদ্ধতিগত, ২. বিজ্ঞান অভিজ্ঞতালব্ধ, ৩. বিজ্ঞান সুশৃঙ্খল, ৪. বিজ্ঞান বিশ্লেষণাত্মক, ৫. বিজ্ঞান আদান-প্রদানযোগ্য এবং ৬. বিজ্ঞান ক্রমপুঞ্জিত। বিজ্ঞানের এ বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা নিম্নে আলোচনা করা হলো ১. সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু : আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন- এ প্রসঙ্গে স্পেন্সার এ. রাথুস বলেন, “মনোবিজ্ঞান প্রত্যাশা, শিক্ষা, স্মৃতি, প্রেষণা, আবেগ, বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি গঠন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে বর্ণনা, ব্যাখ্যা, ধারণা, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত।” ২. অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান : মনোবিজ্ঞান যুক্তি, ধারণা বা বিশ্বাসের চেয়ে, পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে জ্ঞান আহরণ করে । এ প্রসঙ্গে মরগ্যান বলেন- “মনোবিজ্ঞান প্রথমত একটি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। ৩. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার : মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো হলো- পরীক্ষা পদ্ধতি, চিকিৎসামূলক পদ্ধতি, পরিসংখ্যান পদ্ধতি ইত্যাদি অন্যতম। মনোবিজ্ঞান তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আহরণ করতে গিয়ে পুরোপুরি এসব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।

ALSO READ,

৪. ফলাফলের বস্তুনিষ্ঠতা : মনোবিজ্ঞান আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ। আমাদের মনের অভিজ্ঞতা ও আচরণ যেমনভাবে ঘটে ঠিক তেমন ভাবেই তার আলোচনা মনোবিজ্ঞানে হয়। এখানে উচিত, অনুচিতের প্রশ্ন জড়িত নেই। ৫. গবেষণার পুনরাবৃত্তি : মরগ্যান বলেন, “মনোবিজ্ঞানীগণ এমন ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন যা অন্য মনোবিজ্ঞানী কর্তৃক পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে।” মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানকে স্থানভেদে গবেষক বিভিন্ন সময়ে একইভাবে প্রয়োগ করে একই ধরনের ফলাফল পেতে পারেন। গবেষণা পদ্ধতির প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করে। ৬. মাপকের ব্যবহার : বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে মাপকের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তাই মরগ্যান বলেন, “মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত পরিমাপকের তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করেন বা অন্যরা সহজেই পরীক্ষা করতে পারে।” ৭. ভবিষ্যদ্বাণী : বর্তমান সময়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রক্রিয়া মনোবিজ্ঞানে রয়েছে। এরূপ ভবিষ্যদ্বাণীর উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকে আরও নতুন নতুন পরীক্ষার নকশা করা হয়। ৮, সাধারণীকরণ : অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে সাধারণীকরণ বলে। এ প্রসঙ্গে স্পেন্সার এ. রাথুস বলেন, “অনেক মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণা (শিক্ষা, প্রেষণা), আচরণ এবং জৈবিক প্রক্রিয়া কিংবা শারীরবৃত্তীয় মাধ্যমে সংক্রান্ত বিভিন্ন বিবৃত্তির সমন্বয়ে গঠিত। এ সাধারণীকরণ থেকে পরবর্তীতে সূত্র ও তত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করা হয় । ৯. চলকের নিয়ন্ত্রণ : বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরীক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রতিবার চলককে নিয়ন্ত্রণে রেখে অধীন চলকের উপর স্বাধীন চলকের প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা হয়। এক্ষেত্রে স্বাধীন চলককেও প্রয়োজনমতো পরীক্ষণের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয়। চলকের এরূপ নিয়ন্ত্রণ মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে মনোদৈহিক পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে চলকের সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। ১০. প্রয়োগযোগ্যতা: মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান বাস্তব সমস্যা সমাধানে প্রয়োগযোগ্য। মনোবিজ্ঞানীগণ যেসব সূত্র আবিষ্কার করেছেন তা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে। যেমন- বিকল্প ক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগ হচ্ছে। ১১. পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ : গবেষণালব্ধ সংগৃহীত তথ্যসমূহ পরিসংখ্যানের সাহায্য বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উপসংহার: সর্বশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান একটি পদ্ধতিগত বিজ্ঞান। জনৈক মনোবিজ্ঞানী বলেন,“মনোবিজ্ঞান বিষয় হিসেবে অতি পুরাতন হলেও বিজ্ঞান হিসেবে নতুন।”  

Leave a Comment