বাংলাদেশে ভূমি সংস্কার ব্যবস্থার সমস্যাবলী আলোচনা কর

অথবা, বাংলাদেশে ভূমি সংস্কার ব্যবস্থার অসুবিধাসমূহ বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থার অসমতা নতুন সমস্যা নয়। বৃটিশ আমল থেকে বর্তমান বাংলাদেশেও সমস্যা বিরাজমান। এ ভূমি অসমতা সম্পর্কে ১৯৫৬, ১৯৬০, ১৯৭২, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ ভূমি সংস্কারমূলক আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু দরিদ্র্য ভূমিহীন ও ভাগচাষীদের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন হয়নি। এ সমস্যা সামনে রেখে কোন সংস্কার গ্রহণ করা হলে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ৮৫% লোক যেখানে কৃষির উপর নির্ভরশীল তাদের মধ্যে অর্ধাংশের বেশি দরিদ্র কৃষক, অন্যের জমি চাষ করে দিনাতিপাত করে, অন্যের জমিতে মজুরী দিয়ে জীবনযাপন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূমি সংস্কারের জন্য যে সব সমস্যাকে দায়ী করা যায় তাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এ তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়।

বাংলাদেশের ভূমি সংস্কারের সমস্যাবলী : বাংলাদেশের ভূমি সংস্কারের সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনা করা হলো :

(ক) রাজনৈতিক সমস্যা : বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার প্রকৃত অর্থে একটি রাজনৈতিক স্লোগান যা দরিদ্র কৃষকদের সমস্যা নিরসনে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় বসে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষকের মন জয় করার লক্ষ্যে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ ধরে ভূমি ব্যবস্থার যে পরিবর্তন করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে কোন বণ্টনমূলক কার্যক্রম হচ্ছে না। যেমন: জমির সর্বোচ্চ সীমা ১০০ বিঘা নির্ধারণ, ৬০ বিঘা নির্ধারণ ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে নির্ধারণ বণ্টনমূলক হয়নি। বরং যারা বেশি জমির মালিক তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নামেমাত্র হস্তান্তর করেছে। এতে প্রকৃত অর্থে ভূমিহীনরা জমি পায়নি। সমস্যা সমস্যাই রয়ে গেলো।

(খ) অর্থনৈতিক সমস্যা : ভূমি সংস্কারের অর্থনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে কম নয়। রাজনৈতিক সমস্যার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। যে সব সমস্যা অর্থনৈতিকভাবে ভূমি সংস্কারের পিছনে কাজ করছে তা হলো :

১. পরিবারের আয়তন নির্ণয় সমস্যা : জনসংখ্যাধিক্য দেশে পরিবারের আয়তন ছোট করা যেমন সমস্যা তেমনি একটি পরিবারে কতটুকু জমি থাকা দরকার তা নির্ণয় করা সমস্যা। 

২. ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ সমস্যা : একটি পরিবারের কতটুকু জমি হলে তার জীবন নির্ধারণ মেটানো সম্ভব হবে তা নির্ণয় করা যায় না। আবার বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে জমির উর্বরতা বিভিন্ন রকম। কাজেই কোন অঞ্চলের পরিবারের জন্য কতটুকু জমি নির্ধারণ করা দরকার তা একটি বড় সমস্যা।

৩. উদ্বৃত্ত কৃষক নির্ণয় সমস্যা : বাংলাদেশের ৮৫% লোক কৃষিকাজের সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে অধিকাংশ ভূমিহীন। কিন্তু ভাগচাষ বা পরের জমিতে মজুরি দিচ্ছে এ থেকে উদ্বৃত্ত কৃষক খুঁজে বের করা সমস্যা।

৪. উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন সমস্যা : জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করার পর যে উদ্বৃত্ত জমি পাওয়া যায় তা ক্ষুদ্র ও ভূমিহীনদের মাঝে কিভাবে বণ্টন হওয়া দরকার তার সঠিক নীতি প্রণয়ন করা সমস্যা।

৫. ভূমি পরিচালনা সমস্যা : সরকার ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জমি একত্রীকরণ করলে বা উদ্বৃত্ত জমি সমবায়ে হস্তান্তর করলে কোন শ্রেণি ভূমি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে তা সমস্যা। যদি ভূমি মালিকদের পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে পুনরায় ভূমিহীন শ্রমিকদের শোষণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৬. ভূমি সংস্কারের সমস্যা : ভূমি সংস্কার দ্বারা সমবায় খামার গড়ে তুললে বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ হতে দেখা যায় যে, বৃহদায়তন খামারের তুলনায় ক্ষুদ্রায়তন খামারের উৎপাদন বেশি এবং জমির দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কার সমস্যা হিসাবে কাজ করে।

৭. ভাগচাষীর সমস্যা : ভাগচাষীরা উপকরণের ব্যবহার দ্বারা জমির দক্ষতা বৃদ্ধি করলে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে বা নির্দিষ্ট সময়ে জমির ভাগ চাষী পরিবর্তন করলে জমির দক্ষতা বৃদ্ধিকারীর চাষীকে কেন ক্ষতিপূরণ বা অধিক সময় জমি চাষ করার সুযোগ দেয়া হবে না এসব সমস্যা বাংলাদেশের ভূমি সংস্কারের সাথে জড়িত। এবং উপরিউক্ত সমস্যা ছাড়া বাস্তবতায় জমি চাষাবাদের ক্ষেত্রে আরও বহুবিদ সমস্যা সৃষ্টি করে। যারা জমির মালিক যারা জমি চাষ করে তাদের মধ্যে বাধা বিতর্কের অভাব নেই। বাস্তবতায় সমস্যা আরো জটিল।

(গ) সামাজিক সমস্যা : ভূমি সংস্কার আসলে সমগ্র সমাজ কাঠামোর সংস্কারের সাথে জড়িত। সমাজ কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে এবং ভূমি সংস্কার হবে তা সম্ভব নয়। ভূমি সংস্কার করে ধনতন্ত্র ত্বরান্বিত করা যায়। আবার ভূমি সংস্কার করে সমাজতন্ত্র কায়েম করা যায়। সে লক্ষ্যে সরকারের উদ্দেশ্য কি এবং জনসাধারণের ইচ্ছা কি তা জানা দরকার। কিন্তু তাও সমস্যা। আজকের বাংলাদেশে জনসাধারণ যদি ভূমি সংস্কার অর্থে উদ্বৃত্ত জমির বণ্টন, বিদ্যমান ক্ষমতার পুনঃবিন্যাস জনসাধারণের সৃষ্টিশীল ভূমিকার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজেদের নিয়োজিত করে সেক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হবে লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করা।

উপসংহার : উপরিউক্ত বিভিন্ন সমস্যা সমূহের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশের ভূমি সংস্কার সমস্যা একান্তভাবেই বাংলাদেশের সমস্যা। কোন একটি দেশের মডেল হুবহু ব্যবহারযোগ্য নয়। তবে বিভিন্ন দেশের সমস্যার দিকে তাকিয়ে কাজ করতে হবে। যাতে করে ভূমি সংস্কার প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমস্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়।

 

Leave a Comment