ভূমি সংস্কার কি? বাংলাদেশের ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার নীতি আলোচনা কর। 

অথবা, ভূমি সংস্কার কাকে বলে? বাংলাদেশের ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার নীতিসমূহ বর্ণনা কর।

উত্তর :

ভূমিকা : বিশ্বের প্রতিটি দেশেই একটি ভূমি ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি ব্যবস্থা একদিকে যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তেমনিভাবে এটি অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। যেমন- বৃহৎ খামার চাষাবাদের জন্য পুঁজি প্রয়োজন হয়। যাদের বেশি জমি আছে তারা বর্গা দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে যাদের জমি নেই তারা জীবিকার তাগিদে জমি বর্গা নেয়। এভাবেই জমি ব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য বিদ্যমান থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থায় কোন ভারসাম্য নেই। ভূমি ব্যবস্থার সব রকম বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা দূর করে ভারসাম্য আনয়নের উপায় হচ্ছে ভূমি সংস্কার।

ভূমি সংস্কার : ভূমি সংস্কার বলতে বুঝায় দেশে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করে মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত আইন কানুনের সংস্কার করাকে। ভূমি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভূমিতে কৃষক শ্রেণির মালিকানা ও অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে ভূমি সংস্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে এদেশের রেকর্ড পরিমাণ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভূমি ব্যবস্থার মেরুকরণ প্রবণতা ভূমি সংস্কারকে অনিবার্য করে তুলেছে। ভূমি সংস্কার দু’ভাবে হতে পারে। যথা :

(ক) বণ্টনধর্মী : এ ধরনের ভূমি সংস্কারে ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চসীমা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি দেশের ভূমিহীন চাষী ও ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বণ্টন করা। এক্ষেত্রে লাঙ্গল যার জমি তার নীতি অনুসৃত হবে।

(খ) যৌথধর্মী : যৌথধর্মী ভূমি সংস্কারে জমির ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্ত করে সরকারি মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষি ভূমিকে যৌথ খামার বা রাষ্ট্রীয় খামারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা। এখানে কৃষক শ্রেণি তাদের সাধ্য অনুযায়ী শ্রম দিবে এবং প্রয়োজনানুযায়ী পারিশ্রমিক বা ফসলাদি পাবে। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সরকারের খাদ্য গুদামে জমা হবে এবং দেশের প্রয়োজনে ব্যয় হবে।

১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার নীতি : স্বাধীনতা পরবর্তীকালীন সময় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপকতর ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু হয়। সে লক্ষ্যে কৃষি কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে ভূমি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয়। ফলশ্রুতিতে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি কাঠামোকে আধুনিক ধারায় প্রবর্তনের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ভূমি সংস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। তবে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারায় এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে ১৯৮৪ সালে পুনরায় ভূমি সংস্কারকে আরো গতিশীল করার কতকগুলো নীতিমালা গৃহীত হয়। ১৯৮৪ সালের ২৬ আগস্ট কার্যকরী হওয়া নীতিমালাগুলো ছিল নিম্নরূপ :

১. কোন পরিবার ৬০ বিঘার বেশি জমির মালিকানা থাকতে পারবে না।

২. কোন পরিবার যদি ৬০ বিঘার অতিরিক্ত জমি যে কোনভাবেই গ্রহণ করুক না কেন তার ৬০ বিঘার অধিক জমি সরকারের জমিতে অর্পিত হবে। উত্তরাধিকারে দান বা ইচ্ছাপত্রের মাধ্যমে গৃহীত অতিরিক্ত জমির ক্ষেত্র ব্যতীত ঐভাবে অর্পিত জমির জন্য তাকে কোন ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে না।

৩. বেনামী জমি লেনদেন করা যাবে না। যেমন- কোন ব্যক্তি তার নিজ উপকারার্থে ষাট বিঘার উর্ধ্বে কোন বেনামী ব্যক্তির নামে কোন স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় চলবে না।

৪. বাস্তু হতে উচ্ছেদ করা যাবে না। পল্লী এলাকায় মনিব কর্তৃক বাস্তু হিসাবে ব্যবহৃত অন্য কোন জমি, কোন অফিস, আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ দ্বারা আটক, ক্রোক, বাজেয়াপ্তকরণ বা বিক্রয়সহ সকল আইনগত প্রক্রিয়া হতে অব্যাহতি পাবে। এরূপ জমির মনিবকে কোন উপায়েই উক্ত জমি হতে বঞ্চিত বা উচ্ছেদ করা যাবে না।

৫. বাস্তুর জন্য খাস জমির বন্দোবস্ত করা। পল্লী এলাকায় বাস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার উপযুক্ত কোন খাসজমি পাওয়া গেলে সরকার উক্ত জমি বন্দোবস্ত দেয়ার সময় ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকদের অগ্রাধিকার প্রদান করবেন।

৬. কোন ব্যক্তি তার জমি চাষ করার জন্য অপর কোন ব্যক্তিকে অনুমোদন করবেন না এবং কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির জমি তাদের মধ্যে ঐ জমির উৎপন্ন ফসল ভাগ করে নেয়ার শর্তে চাষ করবে না যদি না তারা অনুরূপ চাষের জন্য নির্ধারিত ফরমে চুক্তি সম্পাদন করেন।

৭. কোন বর্গাচুক্তি পাঁচ বছরের জন্য বৈধ থাকবে।

৮. কোন বর্গাদার জমি বর্গা নেয়ার পর মৃত্যুবরণ করলে মৃত বর্গাদারের পরিবারের জীবিত সদস্যগণ বর্গা জমি চাষ করতে পারবে।

৯. যদি বর্গাদারের কোন সদস্য না থাকে তবে জমির মনিব তা নিজে চাষ করতে পারবে। অথবা অন্য কোন বর্গাদারকে জমি বর্গা দিতে পারবে।

১০. বর্গাদার যুক্তিসঙ্গত কারণে জমি পেতে ব্যর্থ হলে অথবা কোনো চাষ না করে অকৃষিখাতে ব্যবহার করলে জমির মালিক জমি ফিরিয়ে আনতে পারবে। যদি বর্গাদার রীতিমত জমি চাষ করে তবে তাকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চাষের সুযোগ দিতে হবে।

১১. বর্গাজমিতে উৎপন্ন ফসলের ভাগ বণ্টন হবে মনিব জমির জন্য এক তৃতীয়াংশ, বর্গাদার শ্রমের জন্য একতৃতীয়াংশ এবং বাকী এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন খরচ যে করবে, সে পাবে।

১২. বর্গাদারের কাছ থেকে জমির মালিক ফসলের শেয়ার গ্রহণ করার সময় বর্গাদারকে রশিদ প্রদান করবে।

১৩. মনিব যদি বর্গা জমি বিক্রয় করার অভিপ্রায় করেন, তবে মনিব বর্গাদারকে লিখিতভাবে জানাবেন এবং জমি ক্রয়ের সম্মতি আছে কিনা তা প্রস্তাবের তারিখ হতে পনর দিনের মধ্যে লিখিতভাবে মনিবকে অবহিত করেন। দু’জনের আলোচনাসাপেক্ষে জমির দাম নির্ধারিত হবে।

১৪. যদি বর্গাদার ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি ক্রয় করেন, তবে উক্ত জমি সংক্রান্ত বর্গাচুক্তি ক্রেতার উপর বাধ্যতামূলক হবে যেন ক্রেতাই উক্ত চুক্তির একটি পক্ষ ছিলেন।

১৫. কোন বর্গাদার পনের মানানসই বিঘার অধিক জমি চাষ করার অধিকারী হবে না।

১৬. যদি বর্গাদার অতিরিক্ত জমি চাষ করে তবে অতিরিক্ত জমির অতিরিক্ত ফসলের অংশ বাধ্যতামূলকভাবে এর নীতি অনুযায়ী সরকারকে দিতে হবে।

১৭. কোন বর্গাচুক্তি বা সম্পূর্ণ ভোগ বন্ধকের অধীনে অযথা চাকুরে বা শ্রমিক হিসাবে ব্যতীত কোন ব্যক্তিই অপর কোন ব্যক্তির জমি চাষ করবেন না। যদি এ বিধানের লঙ্ঘন হয় এবং অতিরিক্ত জমি চাষ করে তবে উৎপন্ন ফসলের অংশ নীতি অনুযায়ী সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করতে হবে।

উপসংহার : এদেশে জমির তুলনায় মানুষ এতো বেশি যে অনেকে লোকসান দিয়েও জমি চাষ করতে অগ্রসর হয়। সামগ্রিক অর্থে এদেশে কৃষক অনুকূল ভূমি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন মৌলিক ও প্রগতিশীল ভূমি সংস্কার। অন্যথায় এদেশের কৃষি কাঠামোর উন্নয়ন সম্ভব নয় ।

Leave a Comment