বাংলাদেশের কৃষি সমাজ কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা কর

অথবা, স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কৃষি সমাজ কাঠামো কেমন ছিল আলোচনা কর।

উত্তর

ভূমিকা : বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কৃষিনির্ভর গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা ৮৫% জনগণ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষি কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল। কৃষিপ্রধান এদেশের কৃষি কাঠামো ব্যাখ্যাকরণে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দুটি বিষয়কে সহজেই আলাদা করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে কৃষিজ উৎপাদন শক্তি বা Productive Forces এবং অন্যটি হচ্ছে উৎপাদন সম্পর্ক যা Relation of Production । বাংলাদেশের গামীণ উৎপাদিকা শক্তিসমূহের মধ্যে বৈচিত্র্যপূর্ণ অংশীদার এখানকার কৃষিজ কর্মকাণ্ডে দুই ধরনের পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়। যথা : স্ব-ভূমিতে নিয়োজিত কৃষক হচ্ছে অন্যের জমিতে নিয়োজিত কৃষক শ্রণি। এই ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, এখানকার ভূমির মালিকানা ও অমালিকানার মধ্যে লক্ষ্যণীয়। কেননা বেষম্যমূলক অবস্থা বিরাজমান। কেননা কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির বেশি একক হচ্ছে ভূমি। তাই বলা যায় যে, বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন কাঠামোতে বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষি সমাজ কাঠামো বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোর প্রকৃত স্বরূপ উৎঘাটনে এখানকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান অবস্থা আলোচনা করা দরকার। কেননা আজকের বাংলাদেশ এক সময় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্ত ভুক্ত ছিল। তাই এখানকার কৃষি কাঠামোতে বৃটিশ ভারতীয় প্রভাব পরিলক্ষিত । নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো : আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এক সময় বৃটিশ উপনিবেশ শাসনের আওতাভুক্ত ছিল। প্রায় ২ শত বছর বৃটিশ শাসনের পর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু স্বাধীনতা পূর্বকালীন সময়ের সুদীর্ঘকালীন বহিঃশাসন এখানকার সমাজ কাঠমোকে পরনির্ভরশীলতার কাঠামোতে আবদ্ধ করে ফেলেছে। কেননা ১৭৫৭ সালে বৃটিশরা বাংলা-বিহার, উড়িষ্যার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে এখানকার সমাজ কাঠামো ভাঙ্গনের ধারা উন্মোচন করে। তার ধারাবাহিকতায় ১৭৯৩ সালে উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হয় যার ফলশ্রুতিতে বাংলার সনাতন কৃষি কাঠামো ভেঙ্গে যায়। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সম্প্রদায় ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। উনিশ ও বিশ শতকের দুটি পৃথক কাঠামো বাংলার কৃষি কাঠামোকে একটি পর্যায়ে উন্নীত করে। তবে ১৯২০ সালের পূর্বে বাংলার কৃষি কাঠামো ছিল স্থবির ও নিশ্চল। পরাধীনতার জাঁতাকলে মেরুদণ্ডহীন কৃষি কাঠামো ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কিছুটা জাগ্রত হয়। কেননা এ সময় হিন্দু জমিদার, বণিক, মহাজনদের বাহুবন্ধন থেকে বেরিয়ে বাংলার কৃষক স্বাধীনতার সুবাতাস গ্রহণের প্রথম সুযোগ লাভ করে। পরবর্তীতে পূর্ব-পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনীতি থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপরিচয় গ্রহণ করে। ফলে দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শোষণের পরাজিত কৃষি কাঠামোকে এখনো আধুনিক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

২. স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কৃষি কাঠামো : স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন কাঠামোর প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটনের পূর্বে এখানকার কৃষকদের উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়টি জানা দরকার। বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের কৃষকরা নিজের জমি কিংবা অন্যের জমি বর্গা হিসাবে নিয়ে লাঙ্গল বলদ বা গরু, নিম্নমানের বীজ, সার, নিজস্ব পরিবারের শ্রম নিয়ে চাষাবাদ করে। তারা প্রায়ই মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করে পুঁজি তৈরি করে এবং প্রায়ই তারা মৌসুমি বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে থাকে। তারা অনেক সময় ক্ষেত মজুরী ভাড়া হিসাবে নিয়োগ করে থাকে। তবে তার পারিশ্রমিক খুবই কম। মোটকথা এখানকার উৎপাদন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। অন্যদিকে আমাদের দেশে Patron Client Relation ততটা ভাল নয়। কারণ আমাদের দেশের প্রায় কৃষকই মূলধনের অভাবে কৃষি উপকরণ যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে তারা ধনী মহাজনদের নিকট থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করে, কিন্তু ভাল বীজ না পাওয়াতে, সুলভ মূল্যে সার ক্রয় করতে না পারাতে, প্রয়োজনে পানি সেচের ব্যবস্থা না করতে পারাতে এবং প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার ফলে তারা চাহিদার তুলনায় অনেক কম ফসল উৎপাদন করে। ফলে তারা ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে এবং ঋণ শোধ করতে না পারায় তাদের জমি হাতছাড়া হয়ে যায় । এ ভাবে দেখা যায় কৃষকের Relation of Production ততটা ভালো নয়।

উপসংহার : উপরিউক্ত বিষয়গুলো বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি কাঠামোর সামগ্রিক পরিচয় বহন করে। তবে এসব গ্রামীণ বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি কাঠামোর প্রতিচ্ছবিকে নির্দেশ করতে পারে না বলে অনেক গবেষক মন্তব্য করেছেন। গ্রামীণ কৃষি সমাজ কাঠামো সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা চালানো হয়েছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে শ্রেণিভিত্তিক গ্রাম সমাজে জমির অসমবণ্টন বিদ্যমান।

 

Leave a Comment