বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোতে ভূমির মালিকানা ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর

উত্তর : 

ভূমিকা: মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূমিতে পাশ্চাত্যের ন্যায় ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না বলে অভিহিত ব্যক্ত করা হয়। Karl Marx ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এশীয় উৎপাদন প্রণালী বলেছেন। আর Max Weber ক্রমে Prebendalization তথা জমিদার প্রথা সমন্বিত একটি বিশেষ ধরনের ভূমি ব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করেন। ভারতীয় সামন্তবাদে Manor বিষয়ক কোন বৈশিষ্ট্য ছিল না বরং এখানে সামরিক সেবার বিনিময়ে জায়গীর ভোগকারী শ্রেণি সমাজ কাঠামোতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ভূমিরাজস্ব ও সমরবাদ এ দু’টি বৈশিষ্ট্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করেছিল। একদিকে রাজস্ব সংগ্রহকারী শেণি অন্যদিকে।

এ সময়কালে রাষ্ট্র ব্যতীত ৪ শ্রেণির লোকজন জমির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এরা হচ্ছে :

১. জমিদার; 

২. বিভিন্ন রায়তি স্বত্বের অধিকারী; 

৩. রায়ত এবং 

৪. কোরফা রায়ত

বর্গাদার ও ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক ছিল এ ৪ শ্রেণির বাইরে। জমিদার এবং তালুকদারের জমি চাষে খুব কমই আগ্রহ ছিল। চাষাবাদ করা হত রায়ত এবং কোরফা রায়ত দ্বারা। কোরফা রায়তরা রায়তদের কাছ থেকে জমি বর্গা নিত। তাদের জমির পরিমাণ ছিল কম এবং তাদেরকে একর প্রতি উচ্চহারে খাজনা দিতে হতো। গ্রামীণ কৃষি কাঠামোতে অন্যন্য গোষ্ঠী ছিল বর্গাদার এবং কৃষি শ্রমিক। জমির মালিকানার উপর ভিত্তি করে সাধারণত যে ধরনের শ্রেণি বিন্যাস সমাজে দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ :

১. ধনী কৃষক : যারা ১০ একরের চাইতে বড় আকারের জমির মালিক।

২. মধ্য কৃষক : যারা ৪ হতে ১০ একর পর্যন্ত খামার বা জোতের মালিক।

৩. ক্ষুদ্র কৃষক : এদের মধ্যে দু’টি ভাগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন :

ক) দুই থেকে চার একরের পরিবার এবং জমিদারদের নামমাত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল ।

খ) দুই একরের কম পরিবার

৪. বাস্তুভিটা আছে এমন কৃষক : এদের মধ্যে বর্গাদার এবং কৃষি শ্রমিকরা রয়েছে। জোতের বিবেচনায় বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোতে ধনী এবং মধ্য কৃষকদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পূর্বে গ্রামীণ অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার ছিল হিন্দু। পরবর্তীতে মুসলিম ভূমিস্বামীদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বাংলাদেশের বর্তমান ভূমি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এখানে ভূমি মালিকানার বণ্টন অসম। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ভূমিহীন অথচ ক্ষুদ্র কৃষি পরিবারের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মধ্য কৃষকরা সর্বাধিক জমির মালিক। ভূমি মালিকানার দিক থেকে দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে কৃষি জোতের গড় আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সামাজিক কাঠামোতে মধ্য এবং বড় জোতের প্রভাব আকারকে ক্ষুদ্রতর করেছে। তাই পৃথকীকরণ এবং মেরুকরণ এই দুই কাঠামোই গ্রামীণ কৃষি কাঠামোতে ভূমি মালিকানার মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্য ঘাটতি, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, কৃষিপণ্যের প্রচণ্ড মূল্যবৃদ্ধি দেশে ভূমি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। ছোট কৃষক এবং বর্গাদাররা এর ফলে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করলে উদ্বৃত্ত জমির মালিকানা বর্গাচাষের জন্য জমির পরিমাণ কমতে থাকে। ফলে ক্ষুদ্র কৃষক এবং ভূমিহীন বর্গাদারেরা দ্রুতগতিতে ক্রমশ গরীব এবং ভূমিহীন হচ্ছে।

উপসংহার : সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোকে কোন ধরনের উৎপাদন পদ্ধতি বলা যায় তা নিয়ে তাত্ত্বিকদের মাঝে বিতর্ক য়েছে। বিশিষ্ট গবেষক আখলাকুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশের কৃষি মূলত ধনতান্ত্রিক। তবে বাংলাদেশের কৃষি কাঠামোতে পরিবর্তনের মূলে স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ১৯৫০ সালের জমিদারী ব্যবস্থা রহিতকরণ আইন, ১৯৭১ সালের পরবর্তী ভূমি সংস্কার ইত্যাদি ব্যবস্থাবলি ভূমি মালিকানা ধরনের মধ্যে কোন পরিবর্তন আনয়ন করেনি।

 

Leave a Comment