কৃষি সমাজ কাঠামোর প্রকৃতি আলোচনা কর

অথবা, কৃষি সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ একটি কৃষি উৎপাদনভিত্তিক গ্রামীণ জনপদ। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার যে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ কাঠামো বিদ্যমান থাকে তাকে কৃষি সমাজ কাঠামো বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি অনেক বিস্তৃত বিষয়। একে এককথায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। কেননা সমাজের প্রকৃতি ও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে কৃষির কাঠামোর ব্যবস্থারও রূপ প্রকৃতি ভিন্নতর হয়। অন্যভাবে বলা যায় যে, কৃষক সমাজ ও কৃষিজ কর্মকাণ্ডের কাঠামোবদ্ধ রূপই কৃষি সমাজ কাঠামো। এতে কৃষি উৎপাদন কাঠামো বা উৎপাদন প্রণালী অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ কৃষক সমাজের কৃষি কাঠামো নির্মাণ করে।

কৃষি সমাজ কাঠামোর প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য : কৃষি সমাজ কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কৃষক পরিবারের প্রান্তিক উৎপাদন কর্মকাণ্ড। কেননা কৃষক পরিবার তাদের জীবন নির্বাহের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই সকল কাজকর্ম চালিয়ে যায়। এ উৎপাদন পদ্ধতির আরেকটি অন্যতম দিক হচ্ছে সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা। কৃষকদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা একটি স্বতন্ত্র উৎপাদন কাঠামো হিসাবে স্বীকৃত। কৃষি উৎপাদন কাঠামো বহুবিদ উপাদান দ্বারা প্রভাবিত। তাই যে সকল উপাদান দ্বারা গ্রামীণ কৃষির প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করা যায় সেগুলোকে গ্রামীণ কৃষি সমাজ কাঠামোর মৌল পরিচায়ক বলা যেতে পারে। এসকল উপাদানগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো :

প্রথমত : বহুবিদ সামাজিক উপাদানের প্রভাবে গ্রামীণ সমাজ কাঠামো সদা পরিবর্তিত হয়। সমাজ কাঠামোর মৌল উপাদান হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা, তাই উৎপাদন ব্যবস্থারও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা সময়ের আবর্তে কাঠামোগত রূপ পরিবর্তনে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয়ত : গ্রামীণ সমাজের ভূমি ব্যবস্থার ধরন হচ্ছে বৈষম্যমূলক। কেননা একটি দেশের মোট জমির প্রায় ৫০ শতাংশ মুষ্টিমেয় সামাজিক শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। তাছাড়া কৃষক শ্রেণির অধিকাংশই ন্যূনতম জমির মালিক এবং অনেকে আবার ভূমিহীন নিঃস্ব। তাই উৎপাদন কাঠামোতে তাদের ভূমিকা থাকে কম। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমির মালিকদের সাথে কৃষকদের প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক তৈরি হয়। কায়িক শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর কিয়দাংশই তারা ভোগ করতে পারে। উদ্ধৃত আত্মসাতের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র

তৃতীয়ত : গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শ্রমশক্তি গ্রামীণ কৃষি কাঠামোকে সবল রাখে। কিন্তু গ্রামীণ এ শ্রমিক শ্রেণি দেয়। গ্রামীণ কৃষি কাজের মূল চালিকা শক্তি হিসাবে ভূমিহীন কৃষক ও দিন মজুরদের চিহ্নিত করা হয়। 

চতুর্থত : গ্রামীণ কৃষিজ জমির ৫০ শতাংশই এমন শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত যারা সরাসরি কৃষিকাজে সম্পৃক্ত নয়। তারা জমি ভাগ চাষের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করে শহরে কিংবা গ্রামেই স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বৃদ্ধি, দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর পারিবারিক সদস্য বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে ভূমিহীন কৃষকরা প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে। ফলে সমাজে ভাগ চাষীর ক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

পঞ্চমত : গ্রামীণ কৃষি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হচ্ছে জমির মালিক ও অকৃষক শ্রেণি। এরা সংখ্যায় গ্রামীণ মাঝারী কৃষকদের চেয়ে কিছুটা কম হলেও ধনী কৃষকদের সমান। গ্রামীণ সমাজ কাঠামোতে এরা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা তাদের জমি যারা ভাগচাষ করে তারা সর্বদা তাদেরকে সমীহ করে এবং তাদের স্বার্থে এগিয়ে আসে।

ষষ্ঠত : গ্রামীণ কৃষি কাঠামোর সাথে গ্রামীণ অকৃষিজ পেশার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্রতা থাকে। কেননা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৃষি আধুনিকায়নের ফলে কৃষকরা বীজ, সার, কীটনাশক ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষাবাদ করতে গিয়ে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরে নিয়োজিত কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতে কৃষি সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর সাথে কৃষকদের বিভিন্ন ইস্যুতে সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায় ।

সপ্তমত : সনাতন কৃষি কাঠামোর সাথে আধুনিক গ্রামীণ সমাজের কৃষি কাঠামোর বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সম্প্রদায়ের সমাজ কাঠামো মৌল ভিত্তি ছিল কৃষি। কিন্তু আধুনিককালে গ্রামীণ কৃষক সমাজের মৌল কাঠামো একমাত্র কৃষিনির্ভর নয়। অকৃষি পেশা মুদ্র অর্থনীতির প্রভাব বর্তমান কৃষি কাঠামোকে উন্নতর পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

অষ্টমত : গ্রামীণ কৃষি কাঠামো এখন আর গ্রামীণ সনাতন কালের চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকরা এখন জমিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে আরুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনের কাঠামোকে যেমন উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করেছে, তেমনি কৃষকদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নকেও ত্বরান্বিত করছে।

নবমত : বিশ্ব বাণিজ্য স্বার্থ সম্প্রসারণের ফলে সনাতন কৃষি কাঠামো অনেকটা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। কেননা জীবন নির্বাহী কৃষি ব্যবস্থায় জমি চাষাবাদে জমির উর্বরতা অটুট থাকে কিন্তু মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কৃষি ব্যবস্থায় সার, কীটনাশক, ট্রাক্টরের ব্যবহার শুরু হয় যা জমির উর্বরতাই নষ্ট করে না বরং পরিবেশকেও মারাত্মক ক্ষতিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দশমত : গ্রামীণ কৃষি কাঠামোর মৌল দিক হচ্ছে কৃষি জমির মালিকানার মেরুকরণ বর্গা প্রথা এবং ভূমিহীন মজুর শ্রেণির বৃদ্ধি । কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় গ্রামীণ ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণি সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে আর জমির মালিকানা চলে যাচ্ছে উচ্চ শ্রেণির কৃষক বা গ্রামীণ সমাজে অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের হাতে। ফলে বাড়ছে বর্গা প্রথা ও মজুরি শ্রমিকদের সংখ্যা।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, গ্রামীণ কৃষি সমাজ কাঠামো হচ্ছে কৃষক সমাজের মৌল পরিচায়ক। কেননা কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনের সামগ্রিক দিক কৃষি সমাজ কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়। যে কোন গ্রামীণ সমাজই মূলত কৃষিনির্ভর জীবন ব্যবস্থায় আবর্তিত। কৃষির আধুনিকায়ন কৃষি কাঠামোকে উন্নয়ন মানে কৃষক সমাজের উন্নয়ন। তাই গ্রামীণ সমাজ বিজ্ঞানে কৃষক সমাজ কাঠামো ও কৃষি কাঠামো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় বলে স্বীকৃত।

Leave a Comment